উজ্জ্বল পাল, বিষ্ণুপুর: বিষ্ণুপুর হাইস্কুল মোড় থেকে দলমাদল রোডের দিকে কয়েক পা এগোলেই চোখে পড়ে একটি রুটি-ঘুগনির দোকান। ছোট হলেও বেশ ভালোই ভিড় জমে। এলাকায় চন্দন কুণ্ডুর দোকান বলে পরিচিত। সকাল থেকে তিনিই খদ্দেরদের সামলান। সন্ধ্যা হলেই ভিড় আরও বাড়ে। একার হাতে আর পেরে ওঠেন না চন্দনবাবু। ডাক পড়ে স্ত্রী নিলীমা ও ছোট মেয়ে বর্ষার। মা-মেয়ে চার হাতে রুটি তৈরি করেন। খদ্দেরদের দেখাশোনা করেন চন্দনবাবু। বর্ষা বিষ্ণুপুর হাইস্কুলেরই ছাত্রী। এলাকায় চেনা মুখ। বাবার দোকানে তাঁকে রুটি বেলতে দেখে এতদিন কারও তেমন কৌতূহল ছিল না। থাকার কথাও নয়। সবাই ভাবতেন গরিব পরিবারের আর পাঁচটা মেয়ের মতো বর্ষাও একজন। সেই বর্ষাই এখন সবার নজরে। পাঁচ বছর পর তাঁর গলায় ঝুলবে স্টেথো। সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এ বর্ষার র্যাঙ্ক ১২ হাজার ৫৫৫। কোনওরকম কোচিং ছাড়াই এই সাফল্য। স্মার্ট ফোনই ছিল তাঁর ‘কোচিং সেন্টার’! চন্দনবাবুর দোকানে এখন খদ্দেররা এলে ভবিষ্যতের ‘লেডি ডক্টর’কে বাহবা দিতে ভোলেন না।
শহরের কালাচাঁদ এলাকায় বাড়ি চন্দনবাবুর। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে তাঁর অভাবের সংসার। রুটি-ঘুগনির দোকানই উপার্জন-অবলম্বন। বড় মেয়ে পিউকে খুব কষ্ট করে নার্সিং পড়াচ্ছেন। ছোট মেয়েকে সেভাবে টিউশনিও দিতে পারেননি। উল্টে সংসারের হাল ধরতে তাঁকেও শামিল করান দোকানে। কিন্তু, জীবনে বড় হওয়ার তাগিদ ছাড়েননি বর্ষা। দোকানে রুটি তৈরির কাজ করেও পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছেন নিজের মতো করে। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক সহ একাধিক প্ল্যাটফর্মে ছাত্রছাত্রীরা যখন বিনোদনে বুঁদ থাকে, তখন বর্ষা অনলাইনে অঙ্ক-বিজ্ঞানের সমাধান খোঁজে। প্রস্তুতি নিতেন নিটের। এটাই তাঁর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। ২০২৪ সালে বিষ্ণুপুর হাইস্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন তিনি। পরের বছর অল্পের জন্য নিটে সাফল্য আসেনি। তবে, এইমসে নার্সিং পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। ২০২৬ সালে ফের নিটে বসেন। ভালো পরীক্ষা দিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তারপরেই প্রশ্ন ফাঁস। পরীক্ষা বাতিল। মনমরা হয়ে যান বর্ষা। কিন্তু, ভেঙে পড়েননি। দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দেন। রেজাল্ট বেরোতেই খুশিতে আত্মহারা তিনি। আক্ষেপ শুধু একটাই—‘প্রশ্নপত্র ফাঁস না হলে প্রথম পরীক্ষায় র্যাঙ্ক আমার ভালো হতো।’
বুধবার বাবার দোকানে রুটি বেলতে বেলতে বর্ষা বলছিলেন, ‘পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় খুব মুষড়ে পড়েছিলাাম। তবে হাল ছাড়িনি। দ্বিতীয়বার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। আমার সাফল্যের পিছনে আমার বাবা-মা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবদান ভোলার নয়। ওঁদের আশীর্বাদ আমি পেয়েছি।’ স্কুলের প্রধান শিক্ষক জীবনানন্দ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘আমাদের আশীর্বাদের চেয়েও বড় কথা ওর অদম্য মনোবল আর অধ্যাবসায়। বর্ষা পড়াশোনায় ভালো ছিল। আজ ওর এই সাফল্যে আমরা গর্বিত।’ বর্ষা পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের সব কাজেও পারদর্শী। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সবকিছু। বর্ষা বলছিলেন, ‘সন্ধ্যার সময় আমাদের দোকানে খদ্দের বেশি থাকে। বাবা একা সামলাতে পারে না। আমি রোজ বিকেলে গিয়ে রুটি বানিয়ে দিই।’
নিলীমাদেবী এদিন বলেন, ‘অভাবের কারণে দুই মেয়েকে ঠিক মতো টিউশনি দিতে পারিনি। দু’জনেই নিজের চেষ্টাতেই পড়াশোনা করেছে। বর্ষার সাফল্যে আমরা ভীষণ খুশি।’ চন্দনবাবু বলেন, সংসার চালাতে ও দুই মেয়ের পড়াশুনার খরচ সামলাতে এই দোকানই আমার ভরসা। মেয়েকে ভালো কোচিং দিতে পারিনি। অনলাইনেই ও পড়াশোনা করেছে। বাবা হিসেবে আমি গর্বিত।’