


পি চিদম্বরম: বাজেট অধিবেশনের আর্থিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর, গত ২ এপ্রিল সংসদের উভয় কক্ষ মুলতবি ঘোষণা করা হয়। অধিবেশন মুলতবির এটাই ছিল উপযুক্ত সময়। কারণ অসম ও কেরল রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরি বিধানসভার জন্য ভোটগ্রহণের দিন ধার্য ছিল গত ৯ এপ্রিল। আর সাংসদদের নিজ নিজ কেন্দ্রে ছুটে গিয়ে নির্বাচনি প্রচারে অংশ নেওয়ার জন্য হাতে সময় ছিল মাত্র একসপ্তাহ। তাছাড়া, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় গত ৩০ মার্চ। তামিলনাড়ুতে ভোটগ্রহণ আগামী ২৩ এপ্রিল। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ভোট নেওয়া হবে দুই দফায়—২৩ ও ২৯ এপ্রিল। এমতাবস্থায় এমপিরা নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। সাধারণ ধারণা এই যে, এপ্রিল মাস শেষ হওয়ার আগে সংসদের হাতে সম্পন্ন করার মতো আর কোনো জরুরি কাজ অবশিষ্ট নেই।
দুষ্টু ‘স্যার’
বস্তুত, সংসদের হাতে সত্যিই কোনো জরুরি কাজ ছিল না। সেই মুহূর্তে অসম্পূর্ণ কাজ বলতে ছিল নির্বাচন, কোনোরকম অনাকাঙ্ক্ষিত বিপত্তি ছাড়াই চলতি নির্বাচন প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা। তবে ‘এসআইআর’-এর বিষয়টি কোনো আকস্মিক বিপত্তি নয়। বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত দুষ্টুমি বা দুরভিসন্ধি। ‘এসআইআর’-এর মূল উদ্দেশ্যই হল লক্ষ লক্ষ নাগরিককে তাঁদের ন্যায্য ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা। (দ্রষ্টব্য: ‘কয়েক লক্ষ নাগরিক, আর ভোটার নন!’, বর্তমান, ২৩ মার্চ, ২০২৬)।
কিছু উগ্র রাজনৈতিক ভাষণ ছাড়া, সামগ্রিকভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়াটি কিন্তু বেশ সুষ্ঠুভাবেই এগিয়ে চলছিল। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ‘এসআইআর’-কে কেন্দ্র করে যে আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত হয়েছিল, তা তখন সুপ্রিম কোর্টে চলছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, সম্ভবত কেউই আদালতের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেননি যে, ‘এসআইআর’-ক্লিষ্ট রাজ্যগুলির প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার গড়ে ১০ শতাংশ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে! বলা বাহুল্য, সটান কেড়ে নেওয়া হয়েছে তাঁদের ভোটাধিকার। এই রাজ্যগুলির মধ্যে রয়েছে কেরল, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গ।
কার মস্তিষ্কপ্রসূত?
আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের মনে এমন একটি ধারণার জন্ম হয়েছিল যে, তামিলনাড়ু (২৩৪টি আসন) এবং পশ্চিমবঙ্গের (২৯৪টি আসন) মতো বৃহৎ রাজ্যগুলিতে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই, কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে জোরদার বিতর্কের সৃষ্টি করা প্রয়োজন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংসদ বিষয়ক মন্ত্রীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন তিনি মল্লিকার্জুন খাড়্গের কাছে “সংবিধানের ১০৬তম সংশোধনী আইন কার্যকর করার” বিষয়টি উত্থাপন করেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এই সংশোধনীটি সংসদে পাস হয়েছিল। অথচ সরকার এটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিল পরবর্তী ৩০ মাস। হঠাৎ করেই সরকারের যেন ঘুম ভাঙে। মন্ত্রী এবং বিরোধী দলগুলির মধ্যে চিঠিপত্রের আদান-প্রদান শুরু হয়। মল্লিকার্জুন খাড়্গে ২৯ এপ্রিলের পর একটি সর্বদলীয় বৈঠকের প্রস্তাব দেন। ২৬ মার্চ লেখা মন্ত্রীর চিঠিটি একইসঙ্গে কৌতূহলোদ্দীপক এবং রহস্যময়: তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন যে, “এমন একটি সময়সীমা নির্ধারণ করলে সংসদ ও বিধানসভাগুলিতে মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের বিষয়টি কার্যকর হতে বিলম্ব ঘটবে” এবং “২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগেই এই আইনের বিধানগুলি কার্যকর করার যে পরিকল্পনা রয়েছে, তার বাস্তবায়নযোগ্যতার উপর এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।” এই কথাটি সম্পূর্ণই ভিত্তিহীন ও অর্থহীন। ১৬ এপ্রিল বা ২৯ এপ্রিল—তারিখ যেটাই হোক, এতে ফলাফলের কোনোই তারতম্য ঘটবে না।
সংসদে মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের বিষয়টি দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর করার ভাবনাটি বিজেপির ‘বিশেষ কার্যনির্বাহী দল’ বা ‘হিট-টিম’-এর মাথায় ঠিক কবে এল? নিশ্চিতভাবেই সেইসময়ে নয়, যখন ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে সংসদ ‘সংবিধানের ১০৬তম সংশোধনী বিল’টি পাস করেছিল। বিলটির খসড়া এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে, ২০২৯ সালের আগে এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব ছিল না—বস্তুত তা করা যেতই না; কারণ সংবিধানের ৩৩৪ (ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:
“...লোকসভায় মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ সংক্রান্ত সংবিধানের যে বিধানগুলি... তা কেবল তখনই কার্যকর হবে, যখন ‘সংবিধান (১০৬তম সংশোধনী) আইন, ২০২৩’ কার্যকর হওয়ার পর অনুষ্ঠিত প্রথম জনগণনার প্রাসঙ্গিক পরিসংখ্যান বা তথ্যাদি প্রকাশ পাবে এবং এরপর এই উদ্দেশ্যেই একটি ‘সীমানা পুনর্নির্ধারণ’ (ডিলিমিটেশন) প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে...”
এই বিলটিতে ‘পরে’ (after) শব্দটি তিন-তিনবার যুক্ত করেছিলেন কে—এবং কেন? আমি আমার পূর্ববর্তী একটি কলামে (বিশেষ নিবন্ধ) এই বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেছিলাম (দেখুন: ‘Reservation when? After, after, after’, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩)। আমরা এই আইনের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম। কিন্তু সরকার তখন ছিল স্পিকটি নট! সংবিধানের ৩৩৪(ক) অনুচ্ছেদের ক্রমবিন্যাস এবং সর্বশেষ জনগণনা সম্পন্ন হতে যে সময় লেগেছিল—পাশাপাশি সর্বশেষ সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে যে দীর্ঘ সময় (৬ বছর!) ব্যয় হয়েছিল—তার নিরিখে এটি দিবালোকের মতোই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ‘সংবিধানের ১০৬তম সংশোধনী বিল’টি ছিল অত্যন্ত ধীরগতিসম্পন্ন ও ঢিলেঢালা একটি প্রকল্প।
জয় হোক বা পরাজয়
হঠাৎ করেই সরকার ভীষণ তাড়াহুড়ো শুরু করছে। তারা পরিকল্পনা করছে আগামী ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিলের মধ্যে সংসদ ফের ডাকার ব্যাপারে। এমন জল্পনা চলছিল যে, সরকার এমন এক বা একাধিক বিল নিয়ে আসবে যার মাধ্যমে লোকসভার সদস্য (এমপি) সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮১৬ করা হবে। এছাড়া মোট আসনের তিনভাগের একভাগ সংরক্ষিত থাকবে মহিলাদের জন্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পরবর্তীকালে এই জল্পনায় সিলমোহর দিয়েছেন। এর জন্য একটি সংবিধান সংশোধনী বিল আনার প্রয়োজন হবে, যা সংসদের প্রতিটি কক্ষে ‘বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা’র মাধ্যমে পাস হতে হবে। অর্থাৎ কক্ষের মোট সদস্য সংখ্যার অর্ধেক এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন হবে। লোকসভায় বিজেপি এবং তাদের মিত্র ও সমর্থকদের কাছে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। তবুও, সরকার এই ঝুঁকি নিচ্ছে। কিন্তু কেন?
সরকার আশা করছে যে, লোকসভায় তামিলনাড়ু (৩৯ আসন) এবং পশ্চিমবঙ্গের (২৮ আসন) বিরোধী দলীয় সাংসদরা অনুপস্থিত থাকবেন। কারণ ২৩ এপ্রিল ওই রাজ্য দুটিতে ভোট নেওয়া হবে। সরকারের এই উদ্দেশ্য সৎ বা আন্তরিক নয়। লোকসভার এই লড়াইয়ে জয় হোক বা পরাজয়, বিজেপি এই ইস্যুটিকে নির্বাচনি প্রচারের ময়দানে নিয়ে যাবেই। যদি বিজেপি বিলটি পাস করাতে সক্ষম হয়, তবে তারা সগর্বে প্রচার করবে যে, মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ১৮২ থেকে বাড়িয়ে ২৭২ করেছে। আর যদি হেরে যায়, তবে এর দায় সরাসরি বিরোধীদেরই উপর চাপাবে।
লোকসভার সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে ৮১৬ করার ফলে যে নেতিবাচক দিকগুলি তৈরি হতে পারে, সেই বিষয়ে বিজেপি বিন্দুমাত্রও চিন্তিত নয়। লোকসভা তখন এমন বিশৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারে যে ম্যানেজ করাই কঠিন হবে। একজন সদস্য কথা বলার খুব কমই সুযোগ পাবেন। আর পেলেও তা হবে মাত্র মিনিট কয়েকের জন্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এর ফলে অধিক জনবহুল রাজ্যগুলি এবং যেসব দক্ষিণী রাজ্য তাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এনেছে, তাদের ভোটাধিকারের ক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান আরো চওড়া হয়ে যাবে। এটি বিজেপির সেই চিরাচরিত কৌশলেরই অংশ: ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ বা ‘বিভক্ত করো এবং শাসন করো’।
ধারণাটি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে, আর এজন্য যে সময়টি বেছে নেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত