সঞ্জয় গঙ্গোপাধ্যায়, বারাকপুর: কলকাতা থেকে ইছাপুরের দূরত্ব মেরেকেটে ২৬ কিলোমিটার। বারাকপুর শিল্পাঞ্চলের এই শহর এক প্রাচীন জনপদ। সেখানে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী গৌরাঙ্গ কুইল্যার হাত ধরে তৈরি হচ্ছে মণ্ডপ। আনন্দমঠ কেন্দ্রীয় সর্বজনীনের পুজো এবার ৭৫ বছরে পড়ল। এখানকার এটিই হল প্রাচীনতম পুজো। শিল্পীর ভাবনায় থিম হয়েছে। নাম ‘আশার প্রদীপ’। দশ হাজার এলইডি বাতির আলোয় সেজে উঠছে মণ্ডপ। সমাজের অন্ধকার দূর করে আলোর বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ভাবনা থেকে তৈরি হয়েছে থিম। সোমবার তিনি বলেন, ‘চারদিকে শুধু অন্ধকার। তার মধ্যে আলোর দিশা দেখানো আমাদের এবারের ভাবনা।’ নেট দিয়ে প্রায় ৫০ ফুট উচ্চতার প্যান্ডেল বানিয়েছেন তিনি। প্রতিমা ফাইবারের। আলোর রোশনাইয়ে জ্বলজ্বল করবে গোটা এলাকা। এই এলাকার ঘোষপাড়া রোড, কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে পোস্টারে ছেয়ে গিয়েছে, ‘সব অন্ধকার হবে দূর, ৭৫-এ ইছাপুর’। উদ্যোক্তারা জানান, ৭৫ বছরের আবেগ আমাদের মূলধন। এই পুজোয় সারাবছর ধরে মানুষ আর্থিক সাহায্য করে।
এই প্যান্ডেল থেকে কয়েক পা দূরে হরিসভা প্রাঙ্গণে ইছাপুর আনন্দমঠ হরিসভা সার্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির পুজো। ৭৭তম বর্ষ তাদের। থিম, ‘প্রবাহিনী’। যেখানে দুর্গাকে প্রবাহিনী রূপে চিত্রিত করা হয়েছে। নৌকার উপর দেবী এক পায়ে দাঁড়িয়ে। কোলের উপর মহিষাসুর। দেবী মহিষাসুরকে বধ করছেন না। মণ্ডপশিল্পী বাবু দত্ত জানান, প্রবাহিনীর মনে সেই শক্তি-সেই নারী, যিনি তেমনই এক প্রবাহ যার গতি কখনও থেমে থাকে না। তিনি স্রোতের মধ্য দিয়ে চলমান, বাধা পেরিয়ে এগিয়ে চলা এক চেতনা। সমাজে থাকা অপসংস্কৃতি, অহংকার, ভেদাভেদ, ভ্রান্ত প্রযুক্তি নির্ভরতা এবং আত্মকেন্দ্রিকতাকে ধুয়েমুছে দিয়ে গড়ে তোলেন এক উদার ও সুস্থ সমাজব্যবস্থা। মা এখানে দৈবী শক্তি শুধু নন, তিনি এক ধারাবাহিক সমাজের বিপ্লবের প্রতীক। যিনি জড়তা ভেঙে পরিবর্তনের বয়ে আনা ঝরনার শব্দ।
পুজো কমিটির যুগ্ম সম্পাদক বাবন দে জানান, এই পুজো শুধু একটি উৎসব নয়। বরং এটি একটি সামাজিক বার্তা। যে প্রবাহ রোখা যায় না। যার পরিবর্তন আটকানো যায় না। তাঁর ছোঁয়ায় সমাজ ফিরে পাক হারিয়ে ফেলা ভারসাম্য, সৌন্দর্য ও মানবতা। পুজো উদ্বোধন করবেন বিধায়ক এবং সংগীতশিল্পী অদিতি মুন্সি।
ইছাপুরের চড়কতলা শীতলা মাতা পুজা কমিটির পুজো এবার ৪৯ বছরে পড়ল। এই পুজো কমিটির সভাপতি হলেন উত্তর বারাকপুর পুরসভার চেয়ারম্যান মলয় ঘোষ। তিনি জানান, পুজোর থিম হল, বাঁশের ঘরে মাটির মা। শিল্পী পিন্টু পালের ভাবনায় গড়ে উঠেছে আদিবাসী শিল্পের ঘরানায় তৈরি মণ্ডপ। তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি হচ্ছে প্রতিমা।
গত কয়েক বছর আগে পলতার নেতাজি সংঘ তাজমহল, ভ্যাটিকান সিটি করে পুজোয় আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। দর্শনার্থী সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছিল পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের। সোমবার দেখা গিয়েছে, তারা তৈরি করছে ব্যাংককের বুদ্ধমন্দিরের অনুকরণে মণ্ডপ। ১৮ নম্বর রেলগেটের ধারে এই পুজোয় মানুষের ভিড় জমে। সবমিলিয়ে পলতা-ইছাপুরে বিগ বাজেটের এবং থিমের মিশেলে দুর্গার আগমনের আয়োজন চলছে জোরকদমে।-নিজস্ব চিত্র