Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

তীর্থবিজ্ঞান

তৃ ধাতু (অর্থ=উত্তীর্ণ হওয়া) হইতে তীর্থ শব্দ নিষ্পন্ন হইয়াছে। তীর্থ শব্দের বাচ্য অর্থ অনেক, যথা-শাস্ত্র, যজ্ঞ, গুরু, জলময় বা ভৌম নদী, হ্রদ, সাগর ও কুরুক্ষেত্র ও পুষ্করাদি পবিত্র ক্ষেত্র

তীর্থবিজ্ঞান
  • ৯ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তৃ ধাতু (অর্থ=উত্তীর্ণ হওয়া) হইতে তীর্থ শব্দ নিষ্পন্ন হইয়াছে। তীর্থ শব্দের বাচ্য অর্থ অনেক, যথা-শাস্ত্র, যজ্ঞ, গুরু, জলময় বা ভৌম নদী, হ্রদ, সাগর ও কুরুক্ষেত্র ও পুষ্করাদি পবিত্র ক্ষেত্র। অর্থ যাহা হোক্ না কেন উত্তীর্ণ হওয়া অর্থ প্রত্যেকটিতেই আছে। শাস্ত্র পাপ ও পুণ্য কৰ্ম্মসমূহের নির্দেশ দিয়া মানুষকে পাপকার্য হইতে নিবৃত্ত করেন। সকাম যজ্ঞ মানুষকে পুণ্যবান্ ও পাপহীন করে এবং এইজন্যেই যজ্ঞে পশুবধ হিংসাত্মক হইলেও সকল আচার্যই ব্রহ্মসূত্রের ব্যাখ্যায় যজ্ঞীয় বৈধ হিংসার সমর্থন করিয়াছেন। নিষ্কাম যজ্ঞ মানুষের মনকে বিশুদ্ধ করে। 

Advertisement

সদ্গুরু ও সাধু মহাপুরুষগণের প্রশংসা ও কীর্তি সকল শাস্ত্রেই তারস্বরে বিঘোষিত হইয়াছে। নৌকা যেমন সমুদ্রজলে মগ্ন ব্যক্তিকে উদ্ধার করিয়া তীরে আনে ও তাহার প্রাণরক্ষা করে, ধর্মগুরু ও মহাত্মা সজ্জনগণ সেইরূপ তাঁহাদের আচরণ ও কথামৃতের দ্বারা মানুষকে চরিত্রবান্ ও ঈশ্বরভক্ত করিয়া-সংসারসাগর হইতে চিরতরে উদ্ধার করতঃ শাশ্বত সুখ ও শান্তির অধিকারী করেন। তীর্থপদের সর্বাপেক্ষা সুপ্রসিদ্ধ অর্থ যে পবিত্র গঙ্গাদি নদনদী এবং পুষ্করাদি পুণ্যক্ষেত্র সেইরূপ তীর্থের সংখ্যা ভারতবর্ষে সমধিক। অযোধ্যা, মথুরা, মায়া (হরিদ্বার), বারাণসী, কাঞ্চী, অবন্তী, দ্বারকাপুরী, গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র, কাবেরী, গোদাবরী, কুরুক্ষেত্র, গয়া, প্রভাস, পুষ্কর, আত্রেয়ী, সরযূ, গণ্ডকী ও এইরূপ নানা তীর্থ ও পীঠস্থানাদি ভারতে স্বীকৃত ও বন্দিত। হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, ইহুদী, মুসলিম ও খৃষ্টান প্রভৃতি জাতির প্রত্যেকেরই ধর্মশাস্ত্র সাধুসজ্জন বা পুণ্য নদনদী ভৌম তীর্থক্ষেত্র এবং মন্দির, মসজিদ, গীর্জা ও গুরুদ্বার প্রভৃতি পবিত্র স্থান আছেই। তবে ভারতবর্ষের অতি প্রাচীন ধর্ম, দর্শন, সংস্কৃতি ও সভ্যতা অনুসারে উক্ত সকল প্রকার তীর্থ অর্থাৎ শাস্ত্র, সদগুরু ও নদনদী প্রভৃতি পবিত্র স্থানের সংখ্যা অনেক অধিক। তীর্থের পবিত্রতার তিনটি কারণ—‘প্রভাবদদ্ভুতাদ্‌ ভূমেঃ সলিলস্য চ তেজসা। পরিগ্রহাচ্চ সাধুনাং তীর্থানাং পুণ্যতা স্মৃতা’।। তীর্থের মৃত্তিকার অদ্ভুত শক্তি এবং জলের বিশেষ গুণ তীর্থযাত্রী মাত্রেই অনুভব করেন। চিকিৎসকের পরামর্শে শরীরের অসুস্থতা অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন তীর্থের জলবায়ুতে রোগীর নষ্ট স্বাস্থ্য ক্রমে ক্রমে ভাল হয়। ইহা ব্যবহারিক জগতের কথা। কিন্তু আধ্যাত্মিক বিচারে তীর্থের যে পবিত্রতা তাহা সকলে ঠিক না বুঝিলেও শুদ্ধমনা ব্যক্তিমাত্রেই অনুভব করিতে পারেন। তীর্থক্ষেত্রসমূহ অব্যয় আধ্যাত্মিক ব্যাঙ্ক। বহু সাধু সন্ত তপস্বী আধ্যাত্মিক জ্ঞান, ভক্তি, যোগ ও তপস্যার শক্তি জমা করিয়াছেন, যাহা কোনও দিনই নষ্ট হইবার নহে। বরং পূর্ববর্তী সাধুগণের তপঃশক্তির সহিত পরবর্তী সাধুগণের তপঃশক্তি সংযুক্ত হওয়ায় তীর্থসমূহ আধ্যাত্মিক সম্পদের এক এক অক্ষয় ভাণ্ডার হইয়া আছে। এই জন্যই বহিরাগত তীর্থযাত্রীর তীর্থস্পর্শে সঞ্চিত ও চিত্তশুদ্ধিতে মানসিক কিছু পরিবর্তন দেখা যায়।
পণ্ডিতপ্রবর জ্যোতির্ময় নন্দের ‘জ্যোতির্ময় রচনাঞ্জলি’ থেকে 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ