বিশে, রঘু আর গগন ডাকাতের পুজো ঘিরে আজও উৎসাহ হুগলির মানুষের
  • ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: কালীপুজো আর ডাকাত, এ দু’টি যেন একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। অমাবস্যার রাত, ডাকাতদের হা রে রে চিৎকার, ভয়ালভীষণা কালীপুজোর আসর আর নরবলি। বাংলার সাহিত্য থেকে বাস্তবের ফল্গুধারায় কালীপুজো আর ডাকাত মিলেমিশে আছে। একদা ডাকাতদের মৃগয়াক্ষেত্র হুগলিতেও আছে ডাকাতিয়া কালীপুজোর দীর্ঘ ধারাকথন। জনশ্রুতি আর ইতিহাসের নিঝুম পিদিম জ্বেলে আজও হুগলিতে একাধিক ডাকাতকালীর পুজো হয় ধূমধাম করে। কালের গতিকে ডাকাতরা হারিয়ে গিয়েছে, কিন্তু নাগরিক উচ্ছ্বাসে অমলিন হয়ে আছে কালী আরাধনার দেউল। 

Advertisement

পুজো মরশুম এলেই সেসব ডাকাতিয়া কালীকে ঘিরে নানা জনশ্রুতি আরও একবার নিজেদের নবীকৃত করে নেয়। কখনও কখনও পল্লবিত হয়ে নতুন শাখা জোড়ে জনশ্রুতির শতাব্দীপ্রাচীন বটের ডালে। ইংরেজ শাসনের হুগলিতে সবচেয়ে পরিচিত ডাকাত ছিল, বিশ্বনাথ ওরফে বিশে। অধুনা বলাগড়ের ডুমুরদহতে ছিল তার বাস। গঙ্গা নদীতে পানসি নৌকা নিয়ে ডাকাতি করত বিশে। জনশ্রুতি, ডুমুরদহের বুনোকালী বিশ্বনাথেরই রক্ততর্পণে পুজো পাওয়া কালী মা। একদা নরবলির থানে আজ বৈষ্ণবমতে পুজো হয়। ছাগ মানত করলে শুধু কান কেটে দেবীকে দেওয়া হয়। ব্রিটিশ শাসকে আর তদানীন্তন সময়ের ধনাঢ্যদের ঘুম কেড়ে নেওয়া বিশ্বনাথ আর অতীত। রয়ে গিয়েছে শুধু ডুমুরদহ আর বুনোকালীর পুজো। 
হুগলির পরিচিত জনপদ সিঙ্গুরে আসে গগন ডাকাতের কালীপুজো। পুরুষোত্তমপুরের সেই কালীপুজো আর গগন ডাকাতের সঙ্গে জুড়ে আছে মা সারদামণির কাহিনি। জনশ্রুতি, একদা অসুস্থ পরমহংসকে দেখতে কামারহাটি থেকে দক্ষিণেশ্বর ফিরছিলেন মা সারদা। পথে গগনের দলবলের খপ্পরে পড়েন তিনি। প্রায় বন্দি সারদামণিকে দেখে চমকে গিয়েছিল গগন। তার আরাধ্য দেবী কালীকে সারদা মায়ের মধ্যে দেখতে পেয়েছিল সেই দুর্দান্ত ডাকাত। তারপর? বিপুল যত্নআত্তির আয়োজন হয়েছিল। সারদা মা’কে না খাইয়ে ছাড়তে চায়নি গগন। মা সারদাও না কি খেয়েছিলেন, চাল ও কলাইভাজা। তারপর নিজে মা’কে সঙ্গে করে পরমহংসের দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছিল গগন। পুরুষোত্তমপুরের ডাকাত গগনের সেই পুজোতে আজও চাল ও কলাই ভাজাতেই কালীকে ভোগ দেওয়া হয়। বাংলার ডাকাত সমাজে অত্যন্ত পরিচিত নাম রঘু বা রঘো ডাকাত। 
অনেকেই মনে করেন রঘু নামে অনেক ক’জন ডাকাত ছিল। সেসব নিয়ে তর্ক থাকলেও সাবেক হুগলি পরিচিত ছিল এক রঘু ডাকাতের কারণে। হুগলির ত্রিবেণীর ডাকাতকালীর পুজোর সঙ্গে রঘুর নাম জড়িয়ে আছে। সপ্তগ্রামের বাসুদেবপুর আজও ভীষণদর্শন কালীর পুজো হয়। ডাকাতিয়া কালীকে এক আশ্চর্য ভোগ দেওয়া হয়। ডাকাতিয়া কালী পোড়া ল্যাটা মাছের ভোগ নেন। রঘুর পরে তার শিষ্য বুধোর হাতে দেবী দক্ষিণাকালী পুজো পেতেন। আর সেখানে নাগরিক উদ্যোগের পুজো হয়। কিন্তু অমানিশার নিঝুম রাতে এখনও রঘু-বুধোর কাহিনি নিয়ে নাগরিক মহলে চর্চা হয়। সদ্য শীত পড়তে শুরু করা রাতে সেসব কাহিনি গায়ে কাঁটা দেয়।