


চোখের জলের রং গেরুয়া
শান্তনু দত্তগুপ্ত: কাঁদছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সরকারি চ্যানেলে। গলা ধরে এসেছে। তিনি মেনে নিতে পারছেন না, মহিলা সংরক্ষণ আইনের সংশোধনী আটকে গিয়েছে। লোকসভার অলিন্দে লাট খাচ্ছে তাঁর অহংকার। হয়তো ভেবেছিলেন, সংশোধনী বেরিয়ে গেলে তাঁর জিৎ। আর না বেরোলেও বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রচার করতে পারবেন যে, তারা মহিলা বিরোধী। কিন্তু তিনি ভুলে গেলেও এদেশের মহিলারা ভোলেননি, তিন বছর আগেই মহিলা সংরক্ষণ আইন পাশ হয়ে গিয়েছে। তাতে বিরোধীরাও সম্মতি জানিয়েছিল। এবারেরটা স্রেফ নিজেদের এজেন্ডা পূরণ করার সংশোধনী। জনগণনার আগেই এলাকা পুনর্বিন্যাস সেরে ফেলা। হার যে হবে, সেটা সবাই মোটামুটি বুঝে গিয়েছিল। আর তিনি বোঝেননি? আসলে এই দেশের প্রধানমন্ত্রীর থেকেও বিজেপির নেতা সত্ত্বাটি তাঁর এই মুহূর্তে অনেক বেশি প্রবল হয়ে উঠেছে। যেভাবে হোক ইস্যু খাড়া করতে চাইছেন তিনি। ভোটের ইস্যু। বাংলা দখলের ইস্যু। বঙ্গ বিজেপির উপর তাঁর এতটুকু ভরসা নেই। বুঝে গিয়েছেন, যা করার আমাকেই করতে হবে। শেষ লগ্নে পৌঁছে গিয়েছে। হয় এবার, না হলে নেভার... বাংলা দখলের স্বপ্ন দশ লাখি মোদি কোটের বুকপকেটের নীচেই ফুরিয়ে যাবে। তাই তাঁকে ইস্যু খুঁজে বের করতে হবে। দূরদর্শনের পরদায় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এসে বিজেপি নেতার মতো বক্তব্য রাখতে হবে। যেতে হবে বাংলায়। বারবার। তাঁকে এবং অমিত শাহকে মিলে ৭০-৮০টা সভা ও রোড-শো করতে হবে। আর বঙ্গ বিজেপির নেতারা কমলালেবু ফ্লেভারের লজেঞ্চুস চুসবে। তাই তিনি কাঁদছেন। নিজের ব্যর্থতার জন্য। অস্কার কমিটির দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। এবং বঙ্গ বিজেপির জন্য। কে বলেছে চোখের জলের কোনো রং হয় না? চোখের জলের নতুন রং গেরুয়া।
সংগঠন নেই তো কী? বাহিনী তো আছে!
নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে আর একটি বিষয় মোদি-শাহ নিশ্চিত করে দিয়েছেন—ঝাঁকে ঝাঁকে কেন্দ্রীয় বাহিনী। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, কনফারেন্স চলছে আধাসেনার। বাংলার ভোট নিয়ে। দোতলা হলের রংটাই বদলে গিয়েছে জলপাইতে। ক্যামোফ্লেজ পোশাকের ইউনিফর্ম পরে সবাই বসে আছেন। শুনছেন, কীভাবে বাংলায় ‘সুষ্ঠু ও অবাধ’ ভোট করাতে হবে। ভাবটা এমন, এই যুদ্ধ করতে যাবেন। সেই যুদ্ধ কার বিরুদ্ধে। এই দেশেরই মানুষ। এই বাংলার মানুষ। কারণ, তাঁরা কেন্দ্রের শাসক দলের হ্যাঁতে হ্যাঁ মেলান না। তাঁরা ভোট হলে তৃণমূল কংগ্রেস নামক একটি দলকে পছন্দ করেন। প্রবল প্রতাপান্বিত মহামহিম মোদিজির সেরা সময়েও এরা তাঁকে পাত্তা দেয়নি। তাই এবার আটঘাট বেঁধেই সব শুরু হয়েছে। প্রথমে এসআইআর। অন্য রাজ্যের সঙ্গে বাংলার এই ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণের ফারাক কোথায়? অন্যত্র লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি নেই। এখানে আছে। অন্যত্র অ্যাডজুডিকেশন এবং ট্রাইবুনাল নেই। বাংলায় আছে। আর একটা অঙ্ক—অন্য রাজ্যে খসড়া তালিকায় নাম বাদ গিয়েছে প্রথমে। তারপর যোগ হয়েছে। যেমন তামিলনাড়ুতে ৯৭ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার পর ২৭ লক্ষ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আর বাংলায়? প্রথম দফায় ৫৮ লক্ষ বাদ গিয়েছে। আর তারপর ‘এজেন্ডা পূরণের জন্য’ সেই সংখ্যাটাই নিয়ে যাওয়া হয়েছে ৯১ লক্ষে। কেন্দ্রীয় বাহিনী ভোটের বহু আগে এসে গিয়েছে রাজ্যে। তারা টহল দিচ্ছে। আর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সরাসরি অভিযোগ আসছে তাদের বিরুদ্ধে ভোটারদের প্রভাবিত করার। তারা সাফ বলছে, ‘বিজেপিকে এবার ভোট দিন।’ কেন বলবে তারা? কোন অধিকারে? এখানেই তো আমাদের মতো আম আদমিদের অসুবিধা। আমরা সর্বত্র নীতি-নৈতিকতা খুঁজি। আরে বাবা, এটাও তো ভোটের স্ট্র্যাটেজি! সেইভাবে দেখলেই তো হল। সংগঠন বলে বঙ্গ বিজেপির কিচ্ছুটি নেই। খান চারেক গোষ্ঠী। সবাই সবার পিছনে কাঠি ধরে রয়েছেন। ভবানীপুরে রোড-শো ভরাতে হলদিয়া, তমলুক থেকে বাসে চাপিয়ে লোক ধরে আনতে হচ্ছে। আর জনসভার হিসাব কষলে মোদি-শাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য খান কুড়ি লোক হচ্ছে না। তাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনসভার সঙ্গে তুলনা করলে? হামাগুড়ি খাওয়ার শামিল। আধাসেনাকে তো বাড়তি দায়িত্ব দিতেই হবে। একমাস ধরে টহল, নির্বাচনের চারদিন আগে বুথের দখল নেওয়া, ভোটের দিন লাইনে দাঁড়ানো ভোটার ‘যাচাই’ এবং বারবার মনে করিয়ে দেওয়া, শীতলকুচি বলে এই বাংলাতেই একটা জায়গা আছে। সংগঠন কীসে লাগে?
টুকেই আস্ফালন
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার হবে ৩ হাজার টাকা। যুবসাথীর টাকা বাড়বে। মহিলাদের বাসযাত্রা ফ্রি হবে। এগুলো বিজেপির ইস্তাহারের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হল, এর মধ্যে বিজেপির নিজস্ব ভাবনা বা অবদান কী? একটাও না। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার হল লক্ষ্মীর ভাণ্ডারেরই গেরুয়া সংস্করণ। যদিও দিল্লিতে দেড় বছর পরও কোনো মহিলা আড়াই হাজার টাকা পেয়েছে বলে দাবি করতে পারবেন না। যুবসাথী মমতা চালু করে দিয়েছেন। আর দিল্লির বাসে মহিলাদের বিনামূল্যে যাতায়াত? এটাও কিন্তু আম আদমি পার্টি সরকারের অবদান। বিদ্যুতে ছাড়ও। অর্থাৎ, গোটা ব্যবস্থাপনাই চলছে টুকলিতে। থুড়ি, প্রতিশ্রুতি। তার বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে, তা তো তথ্য-পরিসংখ্যানেই প্রকাশ। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নাকি রেউড়ি রাজনীতির ভয়ংকর বিরোধী। কিন্তু ডবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলিতে অনুদানের কাঁধে ভর করেই তাঁর দল সরকারে আসছে। আর সরকার যদি তৃণমূলের মতো বিরোধী দলের হয়? বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ১০০ দিনের কাজ, আবাস যোজনা, জল জীবন মিশন। এই প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে অভিযোগের সংখ্যা এবং বহর বেশি। তা সত্ত্বেও সেদিকে চোখ বন্ধ করে রাখছেন মোদিজি। ভুগছে শুধু বাংলার মানুষ। কারণ তারা মোদিজির জনপ্রিয়তার রেশ এ রাজ্যের মাটি পর্যন্ত আসতে দিচ্ছে না। তাই মোদিজি কাঁদছেন। হাতরাস নিয়ে নয়, উন্নাও নয়, মণিপুরও নয়। ডিলিমিটেশন বিল কার্যকর না হওয়ায় বলতে গিয়ে গলা ধরে যাচ্ছে তাঁর। টিভিতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে এসে বিজেপি নেতার চাদর গায়ে চড়াচ্ছেন। নারী সশক্তিকরণের দাবি করছেন। এখানেও প্রশ্ন আছে। তাঁর সরকার গত ১২ বছরে নারী ক্ষমতায়নে কী করেছেন তিনি? মহিলা সংরক্ষণ বিল কিন্তু কংগ্রেস সরকারেরই মস্তিষ্কপ্রসূত। তাঁর নয়। ১৯৯২ সালে পঞ্চায়েতে ৩৩ শতাংশ মহিলা প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে। সম্পত্তিতে মহিলাদের আইনি অধিকার স্থাপন হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। পণপ্রথার বিরুদ্ধে আইন ১৯৬১তে। মাতৃত্বকালীন ছুটির অধিকারও ওই বছরেই। ১৯৭৬ সালে মহিলাদের সমান অধিকারের আইন। ২০০৫ সালে গার্হস্থ্য হিংসা বিরোধী আইন এবং হিন্দু উত্তরাধিকার আইন। আর কর্মক্ষেত্রে মহিলা নির্যাতন বিরোধী আইন ২০১৩ সালে। আগের জমানার যাবতীয় প্রকল্পের নাম বদলে নিজেদের বলে প্রথম থেকেই চালিয়ে যাচ্ছে মোদি সরকার। এখন পালা নারী সশক্তিকরণের। কিন্তু মজাটা হল, আম জনতা এখন আর শুধু কথার মুড়ি-মিছরিতে ভোলে না। তারা প্রতিশ্রুতি ও প্রাপ্তির মধ্যে ফারাক যাচাই করতে জানে। মোদিজি অবশ্য এখনও ভাবছেন, কথা দিয়েই বাজিমাত হয়ে যাবে। তাই বাংলায় প্রচারে ‘ঝড়’ তুলছেন তিনি। মুখ দেখাচ্ছেন লাগাতার। ওইটুকুই যে আছে বিজেপির!
মুখ নেই, জেতার ইচ্ছে আছে
বিজেপি বাংলার ভোটে জিতলে মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প মুখটি কে? এই প্রশ্নে বাংলার যে কোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ দশবার ভাববেন। দলবদলু খোকাবাবু যে মুখ্যমন্ত্রী হবেন, সেই ইঙ্গিত মোদিজি নিজে একবারও দিচ্ছেন না। মোদিজি হয়তো ভাবছেন, বারবার সভা বা রোড-শো করে তিনি একাই জিতিয়ে দেবেন। বাংলার মানুষ কিন্তু এই অঙ্কে বিশ্বাসী নয়। তারা যথাযথ বিকল্প খোঁজে। এই রাজ্যে এখনও প্রতীকে ভোট হয় না। মুখ দেখে হয়। সেরকম গ্রহণযোগ্য কাউকে এ রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ খুঁজে পাচ্ছে বলে এখনও তো মনে হয় না। অন্তত জেলায় জেলায় গ্রাউন্ড লেভেলে তেমন কোনো ভাবনা দানা বাঁধছে না। মোদি-শাহের ভরসা প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোট। ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকলে বিরোধী একটা হাওয়া তৈরি হয়ই। তার পিছনেই ফুল স্পিডে ফ্যান লাগিয়েছেন মোদিবাবুরা। তৃণমূলের নামে গাল দেওয়ার অছিলায় বাংলার অপমান করছেন। বাংলার সংস্কৃতি-বাঙালিয়ানাকে টার্গেট করছেন। ভুল বাংলায় কথা বলাটা না হয় এখন গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বাংলার অপমান করলে বাঙালিরা সেই পার্টিকে মাথার মুকুট করে বসাবে তো? উত্তরটা ভেবে দেখতে পারেন।
এটা কি নাট্যশালা?
এবার বাংলায় ভোট হচ্ছে বলে মনেই হচ্ছে না। খানিকটা যুদ্ধ, আর বাকিটা অভিনয়। একেবারে প্রথম সারির। দিল্লির দাদাদের পরতে পরতে অভিনয়ের দৃশ্যে আমরা হতবাক হয়ে যাচ্ছি। বিভূতিভূষণবাবু শনিবার টিভি দেখলে নিশ্চিত বলতেন, খোকা, এটা কি নাট্যশালা? কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেরই বা উপায় কী? ওই যে শুরুতেই বললাম, বঙ্গ বিজেপির উপর আস্থা নেই। তাদের আগ্রাসী প্রচার নেই। আত্মবিশ্বাস নেই। তাই যা করার মোদিবাবু ও শাহভাইকেই করতে হবে। আর কমিশন তো আছেই। তারা তৃণমূলের নাম করে হুমকি দিচ্ছে। বলছে, বার্নল-বোরোলিনের জোগান দেবে। চাপের মুখে সেই পোস্ট কমিশন প্রত্যাহার করেছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের মনে যা ছাপ পড়ার তা পড়েই গিয়েছে। মানুষের সামনে ছবিটা স্পষ্ট—তৃণমূল, বামফ্রন্ট, কংগ্রেসের মতো দলগুলি ভোটে লড়ছে। আর বিজেপি লড়ছে কমিশনকে পাশের আসনে বসিয়ে। তাই ‘বার্নলে’র মতো এমন রাজনৈতিক ভাষা তারা প্রয়োগ করতে পারছে। যদিও তারা ভুলে যাচ্ছে, ইভিএমে কারচুপি না হলে বাংলায় মানুষের ভোটই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তখন বার্নল কাকে এবং কোথায় লাগাতে হবে, সেটা মুখ্য প্রশ্ন হয়ে যাবে না তো?