ভারত একটি প্রধান কৃষিভিত্তিক দেশ। তবে আধুনিক অর্থনীতির দৌড়ে এগিয়ে থাকতে, পাশাপাশি, শিল্পেও যথেষ্ট উন্নতি করা প্রয়োজন। ব্রাজিল, কানাডা, রাশিয়া, ইতালি, ফ্রান্স প্রভৃতি বৃহৎ অর্থনীতিকে আমরা একে একে পিছনে ফেলেছি গত একদশকে। গত দুবছরে ভারত টপকে গিয়েছে যথাক্রমে ইউকে এবং জাপানকেও। সেই সুবাদে ভারত এই মুহূর্তে পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। অর্থনীতির পণ্ডিতদের অভিমত, সব ঠিকঠাক থাকলে অদূর ভবিষ্যতেই ভারত তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। তার জন্য অবশ্য জার্মানিকে টপকে যেতে হবে আমাদের। তারপর আমাদের সামনে থাকবে দুটিমাত্র দেশ—চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আত্মতুষ্টিই হল উন্নতির শত্রু। অগ্রগতি একটি চলমান প্রক্রিয়া। উন্নয়নকে পাখির চোখ করলে, স্বাধীনতার শতবর্ষ, অর্থাৎ ২০৪৭ সালকে সামনে রেখে আমাদের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা চালিয়ে যেতে হবে উপর্যুক্ত দুটি অর্থনীতির সঙ্গে। মনে রাখতে হবে, ভারত অদূর ভবিষ্যতে তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির শিরোপা দখলে সফল হলেও প্রথম এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে আমাদের যে তফাতটা থেকে যাবে তা কিন্তু বিরাট! প্রথম এবং দ্বিতীয় দেশের নমিনাল জিডিপির মধ্যেকার যে ব্যবধান তার ধারেকাছেও থাকবে না ভারত। অর্থাৎ দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের সঙ্গে ভারতের যে লড়াইটা আসতে চলেছে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে তা ‘অসম’ বলেই গণ্য হতে পারে। সোজা কথায়, চীনের সঙ্গে লড়াইটাকে সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলির পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে ভারতকে আগামী দিনে রীতিমতো ম্যাজিক দেখাতে হবে। সেক্ষেত্রে কৃষি এবং পরিষেবায় ব্যাপক উন্নতির পাশাপাশি চমৎকার অগ্রগতি ঘটাতে হবে ইন্ডাস্ট্রি সেক্টরেও। ভারত ইতিমধ্যেই যেসব ক্ষেত্রে সমীহ আদায় করতে সমর্থ হয়েছে, সেগুলিতে এক্সেল করার পাশাপাশি নতুন নতুন শিল্পক্ষেত্র চিহ্নিত করে সেগুলিতেও নজর কাড়তে হবে আন্তর্জাতিক মহলের। তবেই ভারত বিশ্বব্যাপী যথার্থ প্রতিযোগী হিসেবে গ্রাহ্য হবে।
আর এখানেই বিপদ ভারতের। আমাদের সূচনা অনেক ক্ষেত্রে ভালো হলেও আমরা শেষরক্ষা করতে পারি কমই। যেমন ওষুধ শিল্পে ভারত একটি উল্লেখযোগ্য নাম হলেও সেই খ্যাতি অক্ষুণ্ণ রাখায় আমরা আদৌ যত্নবান কি? এর ইতিবাচক উত্তর খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খেতে হচ্ছে বইকি! কেন্দ্রীয় তদন্তে সামনে এসেছে, দেশজুড়ে চলছে নয় নয় করে দশ হাজার কোটি টাকার জাল ওষুধ শিল্প! ভারতের ওষুধ শিল্প ৪৫ হাজার কোটি টাকার এক বৃহৎ সেক্টর। তারই সমান্তরালে জাল ওষুধ শিল্পের রমরমা! গয়া, পাটনা, গাজিয়াবাদ, মুম্বই প্রভৃতি শহরে অভিযান চালিয়ে ভূরি ভূরি জাল ওষুধ উদ্ধার হয়েছে। দেড় বছর ধরে এই প্রবণতা ঊর্ধ্বগামী। ড্রাগ কন্ট্রোলের রিপোর্ট ছিলই। ওইসঙ্গে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রকও জাল ওষুধ শিল্পের বিপদ মানছে। অন্যদিকে, বণিকসভা অ্যাসোচেমের একটি রিপোর্টের দাবি, ভারতের বাজারে ২০ শতাংশই জাল ওষুধ! সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন এবং রাজ্য স্তরের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনস্ট্রেশনের সম্মিলিত রিপোর্টও নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। আর সেটাই উদ্বেগে ফেলেছে অমিত শাহের মন্ত্রককে। তাদের খবর, দেড় বছর ধরে অভিযান চালিয়ে ৭০০ ওষুধ তৈরির ইউনিটকে স্টপ প্রোডাকশন এবং স্টপ টেস্টিং অর্ডার দেওয়া হয়েছে। যোগ্যতামান পেরোতে পারেনি তিন হাজারের বেশি ওষুধের নমুনা। তার মধ্যে বেশিরভাগই জাল।
দিল্লি পুলিশ, সিবিআই এবং এনআইএ মিলে তদন্ত করছে। দেশে মেডিকেল মডিউল মাথাচাড়া দিয়েছে ইতিমধ্যেই। সংগত কারণেই খতিয়ে দেখা হচ্ছে, এই চক্রের সঙ্গে জঙ্গিযোগের বহর কতখানি। দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ, পুদুচেরি, তেলেঙ্গানা, বিহার... একের পর এক রাজ্যের নাম জড়িয়ে গিয়েছে তদন্তে। এও লক্ষণীয় যে, জাল ওষুধের কারবারে যেসব অঞ্চলের ‘নামডাক’ হয়েছে তার বেশিরভাগই ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে অবস্থিত। এই জালিয়াত চক্রের মূল ঘাঁটি যোগীরাজ্য এবং নীতীশ-মুলুক। সিবিআই হানা দিয়েছে একের পর এক স্পটে। চলতি মাসেই বিহারের গয়া, পাটনা, দানাপুর, কাটিহারে বিপুল পরিমাণ জাল ওষুধের সন্ধান মিলেছে। দেশের কিছু সরকারি হাসপাতালের সঙ্গেও জাল ওষুধ চক্রের যোগ সামনে এসেছে। এদের দক্ষিণ ভারতের সাপ্লাই চেইন পুদুচেরিতে। অর্থাৎ সব জেনেও কেন্দ্রীয় সরকার এই পাপ ব্যবসা বন্ধ করতে পারেনি। ব্যাপারটা বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরোতেই পর্যবসিত হয়েছে। এর চরম মূল্য চোকাচ্ছেন কেবল নাগরিকরা, বিপুল দামে ওষুধ কিনেও রোগমুক্ত হতে পারছেন না তাঁরা। অন্যদিকে, বদনাম ছড়িয়ে পড়ছে বিদেশেও। ভারতীয় ওষুধের উপর আন্তর্জাতিক বাজার আস্থা হারালে ওষুধের রপ্তানি বাণিজ্যে ভাটা আসতে পারে। দেশে ‘অমৃতকাল’ আনা দূর, বিরাট স্বপ্নভঙ্গের জন্যই দায়ী থাকবে ব্যর্থ মোদি সরকার।