


বালুচিস্তানে ট্রেন হাইজ্যাকের ঘটনায় মুখে কালি মাখতে হয়েছে পাকিস্তানকে। পাক সেনাবাহিনীর ব্যর্থতা ঢাকতে শেষ পর্যন্ত চিরাচরিত পথই বেছে নিয়েছে ইসলামাবাদ। ভারত-আফগানিস্তানের দিকেই আঙুল তুলেছে তাঁরা। পাক বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র সফকাত আলি খান দাবি করেছেন, ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে মদত দিচ্ছে। আফগানিস্তান থেকেই হামলাটি পরিচালনা করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি। তার জবাবে পাকিস্তানকে বেআব্রু করে দিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, ‘পাকিস্তান যে ভিত্তিহীন অভিযোগ করছে, সেটা আমরা পুরোপুরি খারিজ করে দিচ্ছি। গোটা দুনিয়া জানে, বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর কোথায় অবস্থিত। অন্যদের দিকে আঙুল তোলার আগে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও ব্যর্থতার দায় অন্যদের ঘাড়ে চাপানোর আগে পাকিস্তানের দেশের অভ্যন্তরেই তাকানো উচিত।’ শুধু ভারতই নয়, বালোচ জঙ্গিদের আফগান-যোগের কথা উড়িয়ে দিয়ে কড়া বিবৃতি দিয়েছিল তালিবান সরকারও। তালিবদের তরফে বলা হয়েছে, ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ মন্তব্য না-করে পাকিস্তান নিজেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করুক। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, গোটা বিষয়টি থেকে নজর ঘুরিয়ে নিজেদের পিঠ বাঁচাতেই ভারত-আফগানিস্তানের নাম টেনে আনছে পাকিস্তান। প্রথম থেকেই ওই কাজটা করার চেষ্টা চলছে। ভারতের এই মন্তব্যের পরও সাংবাদিক বৈঠক করে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) পাবলিক রিলেশনস বিভাগের ডিরেক্টর লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী দাবি করেছিলেন, বালুচিস্তানে যে ‘জঙ্গি’ কার্যকলাপ চলছে, তার মূল হোতা ‘পূর্ব দিকে থাকা প্রতিবেশী’ দেশ তথা ভারত। কোয়েট্টা থেকে পেশোয়ারগামী জাফর এক্সপ্রেসে হাইজ্যাকের যে ঘটনা ঘটেছে, সেটাও ওই প্রচেষ্টার ফসল বলে দাবি করেছিলেন আইএসআইয়ের শীর্ষকর্তা। এই একের পর এক মিথ্যাচারের পরিণামে গোটা দুনিয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, বালুচিস্তানে কি ইসলামাবাদের রাশ আরও আলগা হচ্ছে?
মিথ্যে শুধু ভারত-আফগানিস্তান নিয়েই নয়, ‘জাফর এক্সপ্রেস ছিনতাই এবং পণবন্দিদের উদ্ধার নিয়েও মিথ্যে তথ্য ছড়িয়েছে পাক সেনাবাহিনী।’ ‘বালোচ লিবারেশন আর্মি’ (বিএলএ)-র এ-হেন দাবিতে এখন লুকোনোর জায়গা খুঁজছে ইসলামাবাদ। অন্যদিকে রীতিমতো প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করে রাওয়ালপিন্ডির সেনাকর্তাদের ‘মিথ্যে’র ফিরিস্তি দিয়েছে বালোচ বিদ্রোহীরা। পরিস্থিতি সামলাতে ভারত ও আফগানিস্তানের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে মরিয়া শাহবাজ শরিফের সরকার। কিন্তু তা কি সম্ভব? দীর্ঘ দিন ধরেই ভারতের বিরুদ্ধে বালুচিস্তানের বালোচ বিদ্রোহীদের মদত দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে পাকিস্তান। কিছু হলেই নয়াদিল্লির দিকে আঙুল তুলেছে তারা। তাতে কি বালোচদের বিদ্রোহ থামানো গিয়েছে? এভাবে কি ব্যর্থতার মুখ ঢাকা যায়? পাক সেনারা কি শুনতে পায়নি বালোচ বিদ্রোহীদের হুমকি? সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরা’কে বিএলএ কমান্ডার জানিয়েছেন, ‘ওরা বালোচ শিশুদের উপর নির্মম অত্যাচার করে। মহিলাদের তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। সময় থাকতে পাক সেনা নিজেদের শুধরানোর চেষ্টা করুক, না হলে পরিণতি আরও ভয়ানক হতে পারে। পরবর্তী নিশানা হবে ইসলামাবাদ, লাহোর অথবা রাওয়ালপিন্ডি!’
তবে বিন্দুমাত্র শুধরানোর চেষ্টা করেনি পাকিস্তান। উল্টে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনে ফের একবার কাশ্মীর নিয়ে ‘বুলি’ আওড়েছেন পাক প্রতিনিধি। রাষ্ট্রসঙ্ঘে ইসলামোফোবিয়া (মুসলিম বিদ্বেষ) বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস পালন উপলক্ষে পাকিস্তানের প্রাক্তন বিদেশ সচিব তেহমিনা জানজুয়া কাশ্মীর প্রসঙ্গ টেনে নিয়ে এসেছিলেন। তার জবাব দেন রাষ্ট্রসঙ্ঘে নিযুক্ত ভারতের স্থায়ী কূটনীতিক প্রতিনিধি পি হরিশ। বলেন, ‘নিজেদের অভ্যাস মতোই পাকিস্তানের প্রাক্তন বিদেশ সচিব ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে অযাচিত কথা বলেছেন। এই জাতির ধর্মান্ধ মানসিকতা সর্বজনবিদিত। তাদের গোঁড়ামির রেকর্ডও জানা আছে সবার। এই ধরনের প্রচেষ্টায় কিছু যায় আসবে না। জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, আছে এবং সবসময় থাকবে। সেই বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না পাকিস্তান।’ ভারতীয় দূত আরও বলেন, ‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার ঘটনার নিন্দায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের বাকি সদস্যদের সঙ্গে ভারত ঐক্যবদ্ধ। এটা স্বীকার করা অপরিহার্য যে, ধর্মীয় বৈষম্য একটি বৃহত্তর চ্যালেঞ্জ যা সমস্ত ধর্মের অনুসারীদের প্রভাবিত করে। যে কোনও আলোচনার জন্য অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, বিভক্ত নয়।’ বালোচ বিদ্রোহে ক্ষতবিক্ষত ইসলামাবাদ ভারতের থেকে কি এই শিক্ষাটুকু নেবে?