ইসলামাবাদ: বিরতি এসেছে শুধু ‘অপারেশন সিন্দুরে’। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এখনও বন্ধ। সিন্ধু জলচুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তও বহাল। হুঙ্কার দিয়েছে ভারত, ‘সন্ত্রাস এবং আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না। রক্ত ও জল একসঙ্গে বইবে না!’ ভরা গরমে এর ফল হয়েছে ভয়ঙ্কর। দেশের অর্থনীতি তো আগেই ধুঁকছিল। এখন জলের জন্য হাহাকার পাকিস্তানজুড়ে। সেচ দূরে থাক, পানীয় জলের প্রয়োজনটুকুও মিটছে না। ফসল মাঠেই শুকোচ্ছে। ভারতের একের পর এক ধাক্কায় বিধ্বস্ত হয়ে অবশেষে আলোচনার রাস্তা খুলতে মরিয়া হল পাকিস্তান। সেখানেও কড়া শর্ত নয়াদিল্লির— আলোচনা হবে শুধু এবং শুধুমাত্র পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর (পিওকে) এবং সন্ত্রাস নিয়ে। বাধ্য হয়ে তাতেও রাজি পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। এর আগে জলের জন্য দরবার করে চারটি চিঠি দিয়েছিলেন নয়াদিল্লিকে। এবার সৌদি আরবের যুবরাজকে ফোন করে জানালেন, ‘ভারতের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে চাই।’ মঙ্গলবারের সেই ফোনালাপের বিষয়টি বুধবার প্রকাশ করেছে রেডিও পাকিস্তান। তবে শুধুমাত্র জলবণ্টন নয়, সমস্ত অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে আলোচনা চেয়েছেন শরিফ। অর্থাৎ, জম্মু-কাশ্মীর, ব্যবসা এবং অতি অবশ্যই সন্ত্রাস প্রসঙ্গ।
গত মাসে ইরান এবং আজারবাইজান সফরে গিয়েও একই প্রসঙ্গ টেনে এনেছিলেন শাহবাজ শরিফ। শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন অমীমাংসিত সব বিষয় নিয়ে। কিন্তু আগ্রহ দেখায়নি নয়াদিল্লি। কারণ, ‘পিওকে’-র বিষয়টি উল্লেখ করেননি পাক প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এবার সৌদির যুবরাজের কাছে তাঁর প্রস্তাব একদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সদ্য ইরান-ইজরায়েল সংঘাত বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল সৌদি। তাই সেই দেশের যুবরাজের কাছেই আর্জি পেশ করেছেন শরিফ। রেডিও পাকিস্তান সূত্রে খবর, সৌদির যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনকে টেলিফোনে তিনি বলেছেন, ‘ভারতের সঙ্গে সবরকম অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে ইতিবাচক আলোচনায় বসতে চায় পাকিস্তান। এর মধ্যে জম্মু-কাশ্মীর, জলবণ্টন, ব্যবসা এবং সন্ত্রাস প্রসঙ্গ থাকবে।’ এর আগে আলোচনার দাবি তুললেও এত স্পষ্টভাবে সন্ত্রাসের কথা উল্লেখ করেনি পাকিস্তান।
ভারত অবশ্য পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কোনওভাবেই রেয়াত করেনি। গত ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ে ভয়াবহ হামলা চালায় পাকিস্তানি জঙ্গিরা। প্রাণ হারান ২৬ জন, যাঁদের সিংহভাগই পর্যটক। হামলার পরই নিরাপত্তা বিষয়ক ক্যাবিনেট কমিটি বৈঠকে বসে সিন্ধু জলচুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। পাকিস্তানের সঙ্গে সবরকমের ব্যবসাও বন্ধ করা হয়। তার কিছুদিন পরেই প্রত্যাঘাত... মধ্যরাতে শুরু ‘অপারেশন সিন্দুর’। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের একাধিক এলাকায় জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ভারতীয় সেনা। নিকেশ হয় বহু জঙ্গি। তোলপাড় পড়ে যায় গোটা বিশ্বে। পাকিস্তান পাল্টা হামলার রাস্তায় হাঁটলে কড়া জবাব দেওয়া হয় আকাশপথে। ইসলামাবাদের নাকের ডগায় পাক বায়ুসেনার এয়ারবেস গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ভারতের লাগাতার চাপের মুখে শেষপর্যন্ত নতজানু হয় পাকিস্তান। যুদ্ধবিরতির আর্জি জানায়। যদিও তার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত-পাকিস্তানের সংঘর্ষবিরতির কথা ঘোষণা করে দেন।
সংঘর্ষবিরতিতে সায় দিলেও ভারত আলোচনার রাস্তা খুলতে চায়নি। সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, পাকিস্তানকে সন্ত্রাসে মদতদাতা রাষ্ট্র। তাদের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে শুধু পিওকে আর সন্ত্রাস নিয়েই। আর কোনও বিষয়ে নয়। ইতিমধ্যে শুধু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে পাকিস্তানের জঙ্গি সংযোগের কথা তুলে ধরেছেন ভারতীয় সাংসদরা। এতে যথেষ্ট মুখ পুড়েছে পাকিস্তানের। তাই শেষপর্যন্ত নয়াদিল্লির শর্ত মেনেই আলোচনার রাস্তা খুলতে চাইলেন পাক প্রধানমন্ত্রী। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এই মুহূর্তে সে দেশের যা পরিস্থিতি, তাতে এছাড়া আর কোনও উপায় নেই। যদিও পাকিস্তানের এই আলোচনা প্রস্তাব সরাসরি ভারতের কাছে আসেনি। তবে কি সৌদিকে দিয়েই এব্যাপারে মধ্যস্থতা করাতে চায় ইসলামাবাদ?