বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: বুধবারের ঘটনা। এলাকা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী স্বরূপনগর। অভিযোগ, এক ব্যবসায়ী ওষুধ বিক্রির আড়ালে চালাচ্ছিলেন অদ্ভূত কারবার! দোকানের পিছনে প্যাকেট প্যাকেট স্ট্রিপ। কী এগুলি? তাও আবার লাইসেন্স থাকা দোকানের অংশের ঠিক বাইরে। রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোলের অফিসারদের আচমকা হানায় ফাঁস হল, এক ধরনের ব্যথার ওষুধ মজুত করা হয়েছে প্যাকেটে। জিজ্ঞাসাবাদে সামনে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। আন্তর্জাতিক সীমান্তে এই ‘ওষুধের’ নাকি মারাত্মক ডিমান্ড! চুটিয়ে নেশা চলছে তা দিয়ে। কিছু কাশির ওষুধের বেআইনি বাজার নাকি একেবারে ডাউন করে দিয়েছে। ড্রাগ কন্ট্রোলের অফিসাররা শুধু স্বরূপনগরের এই ওষুধের দোকান থেকেই বুধবার পেয়েছেন প্রায় ৪ লক্ষ টাকার ওষুধ। মোট বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে সাড়ে ৬ লক্ষ টাকার সন্দেহজনক একাধিক ওষুধ। অফিসারদের আশঙ্কা, বছরে অন্তত কয়েক কোটি টাকার ওষুধ পাচার চলছে। সম্প্রতি বিএসএফ-বিজিবি বৈঠকে এনিয়ে আলোচনাও হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক সূত্রে খবর, ধানের শিসের মধ্যে, সাইকেলের সাইলেন্সরে হরেক উপায়ে চলে যাচ্ছে ওষুধ।
সূত্রের দাবি, কোডাইন ফসফেট জাতীয় (কোরেক্স, ফেনসিডিল) কাশির ওষুধ নিয়ে সচেতনতা বাড়ায় ও ব্যাপক ধরপাকড় হওয়ায় নেশাড়ুরা খুঁজে নিয়েছে এই নয়া বিকল্প। এমনিতে ব্যথার ওষুধ। তবে যে সে ব্যথার ওষুধ নয়। অপিওয়েড অ্যানালজেসিক। ট্যাপেনটাডোল। মরফিন, পেথিডিন, পেন্টাজোসিন আফিমের মতোই ব্যথায় কাজ করে। ড্রাগ ও কসমেটিকস আইনে সিডিউল এইচ ১ তালিকাভুক্ত। অর্থাৎ প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি নিষিদ্ধ। ব্রেনের সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম বা একেবারে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে এর কাজ। ব্যথার সংবেদই সেখান থেকে পৌঁছাতে দেয় না। একাধিক ব্যথার সমস্যায় অত্যন্ত কার্যকর হলেও নেশাড়ুরা ব্যথা কমাতে নয়, এই পেইন কিলার ব্যবহার করছে তূরীয় মার্গে পৌঁছাতে। এমনকি, ওই ট্যাবলেট গুঁড়ো করে কাগজে রেখে সেই কাগজ পুড়িয়ে নেশা করা চলছে। এই ব্যথানাশকের চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে কালোবাজারে রমরম করে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। সীমান্তের ওপারে রাজশাহী, ফেনি, নওগাঁ, হবিগঞ্জ, যশোরের একাধিক জায়গায় চলছে বিক্রি। শুধু ফেনির বিভিন্ন এলাকা থেকে এ বছর এখনও পর্যন্ত প্রায় ২ লক্ষ ট্যাবলেট উদ্ধার হয়েছে। এপারের কিছু দোকানদার কারবারে জড়িত। ড্রাগ কন্ট্রোলের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, বিএসএফসহ একাধিক এজেন্সি এ বিষয়ে সম্প্রতি সতর্ক করেছে। তারপরই শুরু হয়েছে হানা। স্বরূপনগরের সীমান্ত লাগোয়া ১০টি দোকানের দিকে বিশেষ নজর রয়েছে। বড়বাজারের মেহতা বিল্ডিংয়ে হানার প্রধান কারণও এই ব্যথানাশক। ১০টি ট্যাবলেটের স্ট্রিপের দাম ৪০০-৪৫০ টাকা। কিন্তু গ্রে মার্কেটে হু হু করে বিক্রি হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি দামে। ড্রাগ কন্ট্রোলকে অতি সম্প্রতি রেল পুলিশও সতর্ক করেছে। বিভিন্ন স্টেশনে নেশার ওষুধ পাচার চক্র সক্রিয় থাকতে পারে বলে জানিয়েছে তারা। কলকাতা মেডিকেল কলেজের মেডিসিনের প্রধান ডাঃ সৌমিত্র ঘোষ বলেন, ‘আর্থ্রাইটিস, সায়াটিকাসহ বেশ কিছু সমস্যায় তীব্র ব্যথায় নার্ভের রিসেপটরগুলি ব্লক করতে এই ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। তবে বিনা প্রেসক্রিপশনে অপিওয়েড অ্যানালজিসিক সেবন একদমই করবেন না। এর বহু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আছে।’ স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম বলেন, ‘আমাদের অফিসাররা তাঁদের কাজ করছেন।’