Bartaman Logo
৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পহেলগাঁওয়ের প্রতিশোধ

গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে কিছু বাছাই করা পর্যটককে লক্ষ্য করে জঙ্গি হামলা ঘটেছে। তার জন্য একটি কার্যকর, প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন ছিল। তবে প্রশ্ন ছিল, আমাদের প্রতিক্রিয়াটি কোন স্তরের হবে?

পহেলগাঁওয়ের প্রতিশোধ
  • ১২ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে কিছু বাছাই করা পর্যটককে লক্ষ্য করে জঙ্গি হামলা ঘটেছে। তার জন্য একটি কার্যকর, প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন ছিল। তবে প্রশ্ন ছিল, আমাদের প্রতিক্রিয়াটি কোন স্তরের হবে? 

Advertisement

উগ্র দেশপ্রেমীদের তরফে ‘প্রতিশোধ’ এবং ব্যাপক বদলা নেওয়ারই দাবি উঠেছে। কেউ বুঝছেন না যে, প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের 
মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হতে পারে না। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের গোড়ার দিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিই 
তো হস্তক্ষেপ করেছিলেন। এমনকী, ২০২২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির 
পুতিনকে তিনিই বলেছিলেন যে, ‘এটি যুদ্ধ 
করার যুগ নয়।’ নরেন্দ্র মোদির এই কথাগুলি বিশ্বজুড়ে উষ্ণ প্রশংসিত হয়েছিল। ওই কথাগুলির জন্য ভারতবাসীও তাঁকে একজন ‘শান্তিরক্ষী রাষ্ট্রনায়ক’ হিসেবে প্রশংসা করেছিল।
বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ এই কথাগুলি মনে রেখে ব্যক্তিগতভাবে ভারতকে পরামর্শ দিয়েছে। যুদ্ধ শুরু না-করার অন্যান্য কারণও রয়েছে: প্রথমত, ব্যাপারটা রাশিয়া-ইউক্রেন কিংবা ইজরায়েল-হামাস সংঘাতের মতো নয়, কেননা ভারত-পাকিস্তান দুটি দেশই পারমাণবিক শক্তিধর এবং এই দুই দেশেরই হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের ভার পৃথিবী আর না নিতে পারছে না, সকলেই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ছে। বর্তমানে চলমান দুটি বড় যুদ্ধে এখনও পর্যন্ত ইউক্রেনে ১৩ হাজার এবং গাজায় ৫০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এর বাইরে শত শত মানুষ হতাহত হয়েছে রাশিয়া এবং ইজরায়েলেও। দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে আর-একটি বড় যুদ্ধ বিশ্বের স্থিতিশীলতা এবং অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের দুয়ারে পৌঁছে দিতে পারে।
বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত
নরেন্দ্র মোদি এই সীমাবদ্ধতাগুলি উপলব্ধি করেছেন এবং বিজ্ঞ মানুষের মতোই চিহ্নিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সীমাবদ্ধ সামরিক প্রতিক্রিয়া বেছে নিয়েছেন। গত মঙ্গলবার 
(৭ মে) ভারতীয় বাহিনী ন’টি লক্ষ্যবস্তু (৪টি পাকিস্তানে এবং পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে ৫টি) লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল। এই অভিযানে যেগুলি ধ্বংস হয়েছে সেগুলি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির মূল পরিকাঠামো বলেই মনে হয়। এই ‘লিমিটেড অপারেশন’-এর সিদ্ধান্তটি সুচিন্তিত। পরিমাপ এবং সময় উভয় ক্ষেত্রেই অভিযানের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। একটি ভয়ানক ক্ষুব্ধ দেশের তরফে এটি ছিল এক বৈধ প্রতিক্রিয়া।
প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ভারত কোনোভাবেই অসামরিক বসতি বা সম্পত্তিকে টার্গেট করেনি। এসময় পাকিস্তানের সামরিক পরিকাঠামো লক্ষ্য করেও ভারত সামরিক অভিযান পরিচালনা করেনি। যেমনটা আশঙ্কা করা হয়েছিল, পাল্টা আক্রমণের অছিলায় সেনাবাহিনীর জেনারেল এবং আইএসআইয়ের উস্কানিতে পাকিস্তান কেবলমাত্র নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলওসি) জুড়ে গুলি চালিয়েছে। যদি তারা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধই শুরু করত, তাহলে ৫৭ দেশের অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি) সহ অন্যান্য দেশগুলিরও নিন্দার মুখে পড়ত পাকিস্তান। পাকিস্তানের সামরিক কর্তারা আগামী দিনে এবং সপ্তাহগুলিতে আরও আক্রমণাত্মকভাবে প্রতিশোধ নেবেন না—এমনটা ভেবে নেওয়া কিন্তু বোকামিই হবে।
তাছাড়া, এটাও ধরে নেওয়া সমান বোকামি হবে যে ভারতের ৭ মে’র অভিযানে তিনটি টার্গেটেড জঙ্গি সংগঠন—দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ), লস্কর-ই-তোইবা (এলইটি) এবং জয়েশ-ই-মহম্মদ (জেইএম) একেবারে নিকেশ হয়ে গিয়েছে। তাদের নেতৃত্ব এখনও অক্ষত। তাদের অতীত ইতিহাস বলছে যে, তারা দেখিয়ে দিয়েছে নিহত নেতাদের শূন্যস্থান পূরণে জন্য নতুন নেতা তৈরি করে নিতে তারা ওস্তাদ। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পাকিস্তানে এমন যুবক রয়েছে যারা ভারতে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে যোগদান করে প্রশিক্ষণ নিতে এবং অনুপ্রাণিত হতে ইচ্ছুক। তাদের জীবন উৎসর্গ করতেও তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। পাকিস্তানের সামরিক কর্তারা এবং আইএসআই যতদিন ক্ষমতার কাণ্ডারী থাকবে, ততদিন ভারতের জন্য হুমকি শেষ হবে না।
ক্ষতি অনিবার্য
যেকোনও সংঘাতে, এটা আশা করা যায় না যে কেবলমাত্র একপক্ষেরই প্রাণহানি হবে এবং তার সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস হবে। ভারত সরকার স্বীকার করেছে যে ক্রস-বর্ডার ফায়ারিং বা সীমান্ত-পার থেকে ছুটে আসা গোলাগুলিতে ভারতের বেশকিছু সিভিলিয়ন বা সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন। এটা দুঃখজনক এবং বেদনাদায়ক কিন্তু দীর্ঘ সীমান্ত বা নিয়ন্ত্রণরেখার (এলওসি) কারণে, কিছু হতাহতের ঘটনা যে অনিবার্য! এটাও হয়তো ঘটেছে যে, ভারত কিছু সামরিক সরঞ্জামও খুইয়েছে। ভারতীয় বিমান গুলি করে মাটিতে নামানোর এক অসার দাবি অবশ্য পাকিস্তান করেছে। তবে সংবাদ সংস্থা বিবিসি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই প্রশ্নে থতমত খেয়েছেন এবং তুতলেছেন। এত বড় দাবির সমর্থনে তিনি কোনও প্রমাণ পেশ করতে পারেননি। স্বভাবতই গপ্পোটা কাউকেই গেলাতে পারেননি তিনি। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সত্ত্বেও, যদি সীমান্ত পেরিয়ে গোলাবর্ষণ এদিকে অব্যাহত থাকে, তাহলে ভারতীয় পক্ষের ক্ষতি আরও বাড়বে। যুদ্ধ বড়ই নির্মম।
নরেন্দ্র মোদির আমলে কাশ্মীরে জঙ্গি হামলার তিনটি বড় ঘটনা ঘটে গিয়েছে—উরি, পুলওয়ামা এবং পহেলগাঁও। প্রতিটি ঘটনার পরই, সরকার সতর্ক প্রতিক্রিয়াই জানিয়েছে। মনে হচ্ছে সরকার আরও স্পষ্ট এবং স্বচ্ছভাবে কথা বলতে এবং কাজ করতে শিখেছে: ৭ মে’র প্রতিক্রিয়ার পর, সরকার মানচিত্র এবং ছবি প্রকাশ করেছে। একটি বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপে, সরকার দুই তরুণী মহিলা অফিসারকে (একজন সেনাবাহিনীর এবং একজন বিমান বাহিনীর), সরাসরি টেলিভিশনে মিডিয়াকে ব্রিফ করার দায়িত্ব দিয়েছে। সারা দেশ তা দেখছে। তবে একমাত্র তিক্ত বিষয় এটাই যে, ২৪ এপ্রিল এবং ৭ মে অনুষ্ঠিত সর্বদল বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী অনুপস্থিত! জনগণ এও লক্ষ্য করেছে যে, পহেলগাঁও হামলার পর মোদিজি কাশ্মীর সফর করেননি। এমনকী তিনি কোনও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গেও দেখা করেননি। ২০২৩ সালের ৩ মে থেকে সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত মণিপুর। কিন্তু তিনি সেখানে আজও যাননি। কিন্তু কেন, তার কোনও ব্যাখ্যা মেলেনি। প্রধানমন্ত্রীর কাশ্মীর সফর এড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারট‍াকে মণিপুর-বিস্ময়েরই পাশে রাখা যেতে পারে।
দোলচলে পাকিস্তান
প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য, পাকিস্তান ৮ মে তার ট্র্যাক পাল্টে মিসাইল, ড্রোন এবং এয়ারক্রাফট মোতায়েন করেছে। ভারত কাউন্টর-অফেনসিভ লঞ্চ করেছে বা পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। একইসঙ্গে পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি স্থানে ভারত এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম টার্গেট করেছে বা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নিয়েছে। ভারত তাদের পদক্ষেপকে পরিমিত এবং নন-এসকালেটরি বা অনুত্তেজক বললেও পাকিস্তান ব্যাপারটাকে দেখছে তাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে। আমার মনে হয়, ভারত সরকার চাতুর্যের সঙ্গেই বলটি পাকিস্তানের কোর্টে ঠেলে দিয়েছে এবং ইঙ্গিত দিয়েছে যে ‘তোমরা যুদ্ধ চাইলে আমরাও প্রস্তুত’। পাকিস্তানের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে, পহেলগাঁও এবং এর পরিণতিগুলিকে পিছনে রেখে জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণ করা এবং যুদ্ধবিরতির জন্য ভারতের সঙ্গে এখনই কথা বলা।
কিন্তু প্রশ্ন হল, পাকিস্তান নামক দেশটিতে আসল কর্তা কে? প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের (প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ভাই) নেতৃত্বে অস্থির অসামরিক সরকার নাকি পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং নাকি তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই? অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, টগবগে সীমান্ত, যুদ্ধের সতর্কতা, মারাত্মক তীব্র সংঘাত, সীমান্তে পরস্পরের মধ্যে গোলাগুলি বর্ষণ এবং সামরিক ও অসামরিক দুই তরফেই প্রাণহানি, জখম হওয়া প্রভৃতি অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির জন্য নিজেকে সবরকমে তৈরি রাখুন। সামনে কিন্তু কঠিন দিনই আসছে।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ