


পশ্চিম এশিয়ায় চলছে মিসাইল, ড্রোনের যুদ্ধ। তার দরুন সাধারণ মানুষের জীবনযুদ্ধ হয়ে উঠছে কঠিনতর। নব কুরুক্ষেত্র শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। ফলে গৃহস্থের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। জিনিসপত্র এমনিতেই অগ্নিমূল্য। তার মধ্যে রান্নার গ্যাসেরও দাম বেড়েছে একদফা এবং শুরু হয়েছে জোগান সংকট। এবার এলপিজি সংকট বৃদ্ধির লক্ষণই স্পষ্ট। কারণ গ্যাস বহনের প্রধান জলপথ হরমুজ প্রণালী এখনো অবরুদ্ধ। তাই আরো খারাপ দিন আসতে চলেছে বলেই আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মহলের। গৃহস্থ বাড়িতে রান্নার কাজে যে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহৃত হয় সাধারণভাবে তাতে গ্যাস ভরা থাকে ১৪.২ কেজি। কিন্তু এই বেনজির সংকটজনক পরিস্থিতিতে সরকার এলপিজির ব্যবহারে রাশ টানার উপায় খুঁজছে। তাতে আপাতত ভাবনাচিন্তা এইরকম যে, পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হতে থাকলে সিলিন্ডারগুলিতে ৭ বা ১০ কেজি গ্যাস ভরা হবে। পেট্রলিয়াম মন্ত্রক অবশ্য এখনো তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। কিন্তু সরকারের অভ্যন্তরের প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনাই গৃহস্থের জন্য দুঃসংবাদ বইকি! খারাপ খবর কি শুধু গৃহিণীর হেঁশেলের? না। বাণিজ্যিক সিলিন্ডারেও রাশ টানার পথে মোদি সরকার। যেটুকু সুরাহা এখনো অব্দি রয়েছে, তাও অনেকাংশে অতীত হতে পারে যেকোনো দিন।
জরুরি পরিস্থিতিতে সিলিন্ডারে দুই ধরনের রান্নার গ্যাসের পরিমাণ কমানো হলেও বুকিংয়ের নিয়ম কেন্দ্র আপাতত পালটাবে না বলেই বাজারে খবর। তবে গৃহস্থকে গ্যাসের ব্যবহার কমাতে বাধ্য করা হবে সবরকমে। ভারতে ব্যবহৃত রান্নার গ্যাসের প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি হয়ে থাকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি দেখে সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, অদূর ভবিষ্যতে ১০০ শতাংশ জোগান বজায় রাখা সম্ভব হবে না। দেশে এলপিজির মজুত ভাণ্ডারে টান ইতিমধ্যেই লক্ষণীয়। ফলে সরকারকে কিছু বিকল্প ভাবতেই হচ্ছে। যুদ্ধপরিস্থিতির উন্নতি না-হলে, সেইমতো, সিলিন্ডারে গ্যাসের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়াই হবে মোদি সরকারের আশু কৌশল। ১৪.২ কেজি সিলিন্ডারে যেমন ৭ থেকে ১০ কেজি গ্যাস দেওয়া হবে, তেমনই ১০ কেজির প্লাস্টিক সিলিন্ডারে দেওয়া হবে প্রায় ৫ কেজি গ্যাস। সেই সিলিন্ডারের দামও নির্ধারিত হবে পরিমাণের অনুপাতে। সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, সংকটকালে রান্নার গ্যাসের দাম আরো এক দফা বাড়াতেও পারে সরকার। সেক্ষেত্রে কম পরিমাণে ভরা সিলিন্ডারের দাম ঠিক কী দাঁড়াবে সেটা এখনো জল্পনারই বিষয়। বলা বাহুল্য, ইজরায়েল-আমেরিকা জুটি ইরানে হামলা চালানোর দিনকয়েক পর থেকেই গ্যাংস সংকট শুরু হয়ে গিয়েছে। আমাদের দেশে গ্যাসের বুকিং এবং ডেলিভারি নিয়ে সেই যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তার নড়চড় হয়নি। নির্দিষ্ট নম্বরে ফোন করে বুকিং হলো কি না, এখনো বোঝা যাচ্ছে না। আবার বুকিং করে রেফারেন্স নম্বর পেলেও ডেলিভারি অথেন্টিকেশন কোড (ডিএসি) পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে যাচ্ছে। ডিস্ট্রিবিউটরদের অবশ্য দাবি, ডিএসি নম্বর পাওয়া মানে গ্রাহকের বাড়িতে সিলিন্ডার তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবে। কিন্তু ডিএসি জেনারেট করা বা না-করায় গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটরের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। পুরোটাই ইন্ডেন, এইচপি প্রভৃতি কোম্পানি বা সার্ভিস প্রোভাইাডার সংস্থার হাতে।
শনিবার অবশ্য পেট্রলিয়াম মন্ত্রক ঘোষণা করেছে, বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের সরবরাহ আরো ২০ শতাংশ বাড়িয়ে মোট ৫০ শতাংশ করা হবে। তবে পরিস্থিতি আজও স্বস্তিদায়ক নয়, কারণ যুদ্ধের দামামা সমান তালেই বেজে চলেছে। একদিকে ইরান, অন্যদিকে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু—পরস্পরের বিরুদ্ধে হুংকার ছেড়েই যাচ্ছেন যথারীতি। কেউ দমবার পাত্র বলে মনে হয় না। তাই অচলাবস্থা হ্রাসের পরিবর্তে বৃদ্ধিরই আশঙ্কা বাড়ছে। গ্যাস নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত আগামী সপ্তাহে চূড়ান্ত হতে পারে বলেই খবর। সোজা কথায়, চরম বিপদে কেবল উলুখাগড়ারাই। পশ্চিম এশিয়ায় ট্রাম্প অ্যান্ড কোম্পানি যা করছেন, তার সঙ্গে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং জনকল্যাণের কোনো সম্পর্ক নেই। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য স্বার্থসিদ্ধি এবং ট্রাম্প সাহেবের ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করাই এর নেপথ্যে। তার জন্য বিশ্বজুড়ে বাজি ধরা হয়েছে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকাকে। আমেরিকার এই ভূমিকা অবশ্য নতুন নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে দেশটিকে সব জমানাতেই এই অমানবিক ভূমিকায় পাওয়া গিয়েছে। তাই অন্যতম বৃহৎ শক্তি হিসেবে ভারতকে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে কূটনৈতিকভাবেই। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হতে হবে ভারতবাসীর জীবনযাত্রা এবং জীবিকার সর্বাধিক সুরক্ষা ও নিশ্চয়তা। নরেন্দ্র মোদি টানা তিনবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই।