


বিশেষ নিবন্ধ, তন্ময় মল্লিক: চড় চড় করে বাড়ছে তাপমাত্রা। সূর্য যেন আগুন ঢালছে। তারই মধ্যে সাঁই সাঁই করে রঘুনাথপুরের দিকে যাচ্ছে বেশ কয়েকটি বাইক। সামনে বাঁধা লালপতাকা। ঝাড়ুখামারে হাট বসেছে পিচ রাস্তার ধারে। সেখানে দাঁড়িয়ে হাত নাড়তেই বাইক থামালেন এক যুবক। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কিছু বলবেন?’ সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলাম, এদিকে পার্টির কী অবস্থা? উৎসাহের সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘ভালো। পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। যারা চলে গিয়েছিল তারা ফিরছে। আমাদের ভোট বাড়বে। মানুষ বুঝছে, ধর্ম নয়, রাজনীতি হোক কর্ম নিয়ে। তারজন্য দরকার বামেদের।’
আশাটা কীসের? আসন জেতার?
উত্তরে বললেন, ‘জিতব বলছি না। তবে লড়াই দেব। এই যে দেখছেন যারা এই রোদেও মিটিংয়ে যাচ্ছে, একটা সময় তারা মুখ ঘুরিয়ে নিত। এখন নিজেরাই তেল পুড়িয়ে পার্টির মিটিংয়ে যাচ্ছে।’
যুবকের নাম শেখ জাফর। সিপিএমের এরিয়া কমিটির সদস্য। বাইকে স্টার্ট দেওয়ার আগে বললেন, ‘দেওয়ালে পিঠ ঠেকলে এগোনো ছাড়া উপায় থাকে না। আমাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে। তাই এগোতেই হবে।’
জাফর সাহেবের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন হাটে আসা কয়েকজন পাশ থেকে সব শুনছিলেন। সুফল মাহাত বললেন, ‘একটা সময় এই এলাকায় সিপিএম ছাড়া কিছুই ছিল না। কিন্তু ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার পর কেউ পাশে দাঁড়াল না। এখন হাত কামড়ে কী হবে? আরে ফিরবে বললেই কি ফেরানো যায়? আমরাও সিপিএম করতাম। এখন বিজেপি। তবে, ইদানীং সিপিএমের মিছিল, মিটিংয়ে লোক হচ্ছে।’
বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বেঁধেছেন অশোক ভট্টাচার্য
সিপিএম নেতৃত্ব এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে, ‘উনিশে রাম একুশে বাম’ এই হুইস্পারিং ক্যাম্পেন তাদের কতটা ক্ষতি করেছে। সিপিএম নেতৃত্ব এতদিন ‘তৃণমূল-বিজেপি সেটিং’ বলে প্রচার করে প্রকৃত সত্যকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বেঁধে দিয়েছেন সিপিএমের বর্ষীয়ান নেতা মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্য। দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমকে পাশে বসিয়ে তিনি হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন। এরাজ্যে বিজেপির বৃদ্ধির কারণ যে সিপিএম, সেটা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট হয়েছে।
অশোকবাবু বলেছেন, ‘২০১৯ সালে একটা উগ্র হিন্দুত্ববাদ কাজ করেছিল। তাই ওই সময় আমাদের ২২ থেকে ২৩ শতাংশ ভোট বিজেপি পেয়েছিল। সেটা ফিরিয়ে আনতেই হবে। সকলকে বিষয়টা বোঝাতে হবে, বিজেপিকে ভোট দেওয়াটা ভুল। সেই কাজটা আমাদেরই করতে হবে।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অশোকবাবু উপলব্ধি করেছেন, বিজেপিকে সামনে রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উৎখাত করার পলিসি ভুল ছিল। একুশ থেকে দেখতে দেখতে ছাব্বিশ হয়ে গেল। কিন্তু লক্ষ্যপূরণের কোনো লক্ষণ নেই। তাই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা না করে বাস্তবটা স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি বুঝেছেন, রামে যাওয়া ভোট যতক্ষণ না ফেরানো যাচ্ছে, এরাজ্যে সিপিএম কিছুতেই শক্তিশালী হবে না।
এসআইআরের সুবিধা পাবে সিপিএমও
এসআইআর নিয়ে রাজ্যের একটা বড়ো অংশের মানুষ কমিশন ও বিজেপির উপর ক্ষুব্ধ। মুসলিমদের পাশাপাশি প্রচুর হিন্দু ভোটারের নামও বাদ গিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করলেও বিজেপির উপর ক্ষুব্ধ সকলেই তৃণমূলকে ভোট দেবে, এমনটা ভাবা অর্থহীন। কারণ যাঁরা সিপিএম ছেড়ে বিজেপিতে গিয়েছিলেন তাঁরা প্রত্যেকেই তৃণমূল বিরোধী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যেই বিজেপিতে গিয়েছিলেন। ফলে এসআইআর নিয়ে তাঁরা বিজেপির উপর চটে থাকলেও তৃণমূলকে ভোট দেবেন না। সেক্ষেত্রে তাঁরা ফিরতে পারেন সিপিএমে। তাতে সিপিএমের ভোট বৃদ্ধির একটা পরোক্ষ কারণ হতে পারে এসআইআর।
উত্তরবঙ্গের মাদারিহাটের টোটোপাড়া বাসস্ট্যান্ডে মিষ্টির দোকানে বসেছিলেন নিতাই বণিক। ভোটের হাওয়া কোন দিকে জিজ্ঞাসা করায় আর পাঁচজনের মতো নিতাইবাবুও এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পাশে বসে গল্প জুড়তেই মুখ খুলতে শুরু করলেন। বললেন, ‘সিপিএম ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই উত্তরবঙ্গে বিজেপির প্রভাব বেড়েছে। তবে, এবার বিজেপির সেই হাওয়া নেই।’ সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন? উত্তর দিলেন, ‘পেয়েছি। দুই মেয়ের বিয়েতে রূপশ্রী প্রকল্পের টাকা পেয়েছি। দুই মেয়ে কন্যাশ্রী প্রকল্পের টাকা পেয়েছে। স্ত্রী লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা পায়।’
‘সামাজিক প্রকল্পের প্রভাব ভোটে পড়ে?’ প্রশ্নটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন নিতাইবাবু। তারপর বলেন, ‘প্রভাব পড়ে। তবে, ফ্লোটিং ভোটারদের মধ্যে। যারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তাদের যতই দেওয়া হোক না কেন, ভোট তাদের পছন্দের দলকেই দেয়। তবে, এবার এসআইআরের প্রভাব পড়বে। বহু মানুষের নাম বাদ গিয়েছে। সেই সব পরিবার বিজেপির উপর ক্ষুব্ধ।’
তাদের ভোট কোন দিকে যাবে? নিতাইবাবুর উত্তর, ‘সঠিক বলতে পারব না। তবে, বেশিরভাগটা বামে ফিরতে পারে। কারণ স্থানীয় স্তরে তৃণমূলের উপর ক্ষোভ থেকেই তারা বিজেপিতে গিয়েছিল। তাই তৃণমূলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে, এবার যারা বাড়ি পেয়েছে তারা তৃণমূলকে ভোট দিতে পারে।’
এককাট্টা হচ্ছে সংখ্যালঘু ভোট
এসআইআরের নামে মুসলিমদের উপর ‘নির্যাতন কমিশনে’র নিপীড়নের সুফল পাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। কারণ এরাজ্যে কোনো দল নিজেদের কট্টর বিজেপি বিরোধী হিসাবে তুলে ধরতে পারেনি। কংগ্রেস এবং সিপিএম যতটা বিজেপির সমালোচনা করে, তার চেয়েও অনেক বেশি আক্রমণ শানে তৃণমূলকে। তাছাড়া সাংগঠনিকভাবে এবং জনসমর্থনের নিরিখে কংগ্রেস ও সিপিএম রাজ্যের শাসক দলের ধারেকাছে নেই। প্রার্থীর ব্যক্তিগত ক্যারিশ্মা এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের জোরে কয়েকটি আসনে কংগ্রেস জেতার লড়াইয়ে থাকলেও সিপিএম সেই জায়গা তৈরি করতে পারেনি। সেই কারণে সংখ্যালঘুরা তাঁদের ভোট ভাগ করতে চাইবেন না। ভোট ভাগাভাগি হলে বেনিফিট যে বিজেপির, সেটা তাঁরা বিলক্ষণ জানেন। যদিও সিপিএম নেতৃত্বের দাবি, আইএসএফের সঙ্গে জোট হওয়ায় সংখ্যালঘু ভোট তাদের দিকে ফেরার সম্ভাবনা প্রবল।
রামের ভোট বামে ফিরলে বিপাকে পড়বে বিজেপি
সিপিএমের ভোট বাড়লে বিপদ বাড়বে বিজেপির। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ সালের পর থেকে এখনও পর্যন্ত যতগুলি নির্বাচন হয়েছে, তাতে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের ভোট মোটামুটি ধরে রেখেছে। কিন্তু, বামেদের ভোট বিপুল হারে বিজেপিতে ‘শিফ্ট’ হয়েছে। অশোক ভট্টাচার্যের হিসাবে পরিমাণটা ২২ থেকে ২৩ শতাংশ। সেই ভোটের কিছুটা বামে ফিরলে এসআইআরে নাম বাদ দিয়েও লাভ হবে না বিজেপির। ৫০ টপকানোই কঠিন হবে। সেই আশঙ্কা থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রায়ই বলে থাকেন, ‘তৃণমূলের থেকে বামেরা ভালো ছিল।’ এর উদ্দেশ্য যে বামেদের ভোট বিজেপিতে ধরে রাখা, তা বলাই বাহুল্য। তাই এরাজ্যে সিপিএমের ভাষাতেই তৃণমূলকে আক্রমণ করে বিজেপি।
সিপিএমের কাজে সুবিধা হয় বিজেপিরই
সিপিএম নেতৃত্ব মুখে বলে বিজেপি জনগণের শত্রু। সিপিএম এর রাজ্য কমিটি ‘বিজেপি কেন জনগণের শত্রু?’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছে। তার ছত্রে ছত্রে রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল সরকারের সমালোচনা। তাতেই স্পষ্ট হয়, মুখে সিপিএম বিজেপিকে জনগণের শত্রু বললেও আক্রমণের মূল লক্ষ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই কারণেই সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসাতে আইএসএফকে সঙ্গে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সিপিএম।
সিপিএমের টার্গেট মমতা
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোই যে সিপিএমের মূল লক্ষ্য, সেটা ফের প্রমাণ হল পশ্চিম পাঁশকুড়া আসনটি আইএসএফকে ছেড়ে দেওয়ায়। এই আসনে সিপিএম দলের জেলা সম্পাদক নিরঞ্জন সিহিকে প্রার্থী করেছিল। নিরঞ্জনবাবু প্রচারও শুরু করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই জানিয়ে দেওয়া হল, আসনটি আইএসএফকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। একজন জেলা সম্পাদককে প্রার্থী করেও অন্য দলকে আসন ছাড়ার দৃষ্টান্ত সিপিএম পার্টির ইতিহাসে নেই। কিন্তু, কেন এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত?
অনেকে মনে করছেন, পশ্চিম পাঁশকুড়ায় সংখ্যালঘু ভোট ভেঙে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দিতেই আইএসএফকে আসন ছেড়েছে সিপিএম। আসল ‘সেটিং’ এটাই। মেরুদণ্ড বন্ধক দিয়ে ‘শিরদাঁড়া বিক্রি নেই’ বলে ঢালাও প্রচার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে সিপিএম। সেইজন্যই সমাজ বদলের স্বপ্ন নিয়ে মাটি কামড়ে সিপিএম করা প্রতিকুর রহমানরা দল ছাড়ছেন। তাই অশোক ভট্টাচার্য রামে যাওয়া ভোট বামে ফেরানোর জন্য যতই চিৎকার করুন না কেন, তা অরণ্যে রোদন ছাড়া কিছুই নয়।