অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: নদীয়া জেলার বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া কাদিপুর গ্রাম। কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের দিগম্বরপুর, গোবিন্দপুর, বিষ্ণুপুর-সহ একাধিক বুথ নিয়ে গড়ে ওঠা এই সীমান্তবর্তী এলাকায় এখন বদলের হাওয়া। একসময় যেখানে গরু পাচারের মতো অসামাজিক কাজ ছিল বহু মানুষের জীবিকার অন্যতম ভরসা। সেখানে আজ কর্মসংস্থানের নতুন দিশা দেখাচ্ছে ‘আরোগ্য মার্গ’ প্রকল্প। সীমান্তের ভাঙাচোরা রাস্তার ধারে এখন চোখে পড়ে সুসজ্জিত বাগান, ঔষধি গাছের সারি, মৌমাছি পালনের বি-বক্স এবং উন্নতমানের কাঁটাতারের বেড়া।
সীমান্তের রাস্তা ধরে এগোলেই দেখা যায় রাস্তার দু’ধারে গড়ে তোলা হয়েছে সবুজ বাগান। সেখানে লাগানো হয়েছে ঘৃতকুমারী, রজনীগন্ধা-সহ বিভিন্ন ফুল ও ঔষধি গাছ। প্রতিটি গাছের পাশে লেখা রয়েছে তাদের উপকারিতা। পাশাপাশি রাখা হয়েছে মৌমাছি চাষের জন্য বি-বক্স। সীমান্ত সুরক্ষার স্বার্থে রাস্তার ধারে তৈরি করা হয়েছে দীর্ঘ নালা, যাতে সর্বক্ষণ জল ভরে রাখা হয় যাতে গরু পাচারের পথ রোধ করা যায়।
এই গোটা প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গ্রামেরই প্রায় ৩৫ জন বাসিন্দার হাতে। ঘটনাচক্রে, তাঁদের অনেকেই একসময় পাচারচক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে আরোগ্য মার্গের কাজ করেই তাঁদের উপার্জন হচ্ছে এবং সেই আয়েই চলছে সংসার। গ্রামবাসীদের কথায়, সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থানের অভাব ছিল। সেই কারণেই অনেকেই সামান্য টাকার লোভে পাচারের কাজে জড়িয়ে পড়তেন। কেউ ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করে দৈনিক এক হাজার থেকে পনেরশো টাকা পর্যন্ত রোজগার করতেন। শুধু কাদিপুর বা দিগম্বরপুর নয়, সীমান্তবর্তী বহু গ্রামের অবস্থাই ছিল প্রায় একই।
সেই পরিস্থিতি বদলাতেই কেন্দ্র সরকারের উদ্যোগে শুরু হয় ‘ভাইব্রান্ট ভিলেজ’ প্রকল্প। তারই পাইলট প্রকল্প হিসেবে বেছে নেওয়া হয় কৃষ্ণগঞ্জের কাদিপুর গ্রামকে। লক্ষ্য ছিল উন্নতমানের কাঁটাতারের মাধ্যমে সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা এবং গ্রামের মানুষকে পাচারের মতো অসামাজিক কাজ থেকে সরিয়ে বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করে দেওয়া। সেই উদ্দেশ্যেই মৌমাছি চাষ, বাগান তৈরি ও ঔষধি গাছের চাষে জোর দেওয়া হয়।
বিএসএফের সহযোগিতায় গত এক বছর ধরে এই প্রকল্পের কাজ চলছে। শুরুতে যুবকদের পাশাপাশি স্বল্পবয়সি মহিলারাও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। বর্তমানে অধিকাংশ কর্মী পুরুষ হলেও, মহিলাদেরও এই কাজে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে জানা গিয়েছে।
প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত জটিরবক্স শেখ বলেন, ‘আগে গ্রামের অনেকেই অসামাজিক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তেন। কিন্তু আরোগ্য মার্গ শুরু হওয়ার পর গ্রামের মানুষ খুব উৎসাহ নিয়ে কাজ করছেন। আগে আড়াইশোটি বি-বক্স ছিল, এখন আরও ৫০টি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। রজনীগন্ধা চাষও শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের ফলে গ্রামের অনেক পরিবর্তন এসেছে।’ গ্রামবাসীদের একাংশের মতে, শুধুমাত্র সীমান্ত সুরক্ষা নয়, এই উদ্যোগ গ্রামের সামাজিক পরিবেশও বদলে দিয়েছে। বহু পরিবার এখন নিয়মিত আয়ের সুযোগ পাচ্ছে। রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এই ধরনের কর্মসংস্থানমূলক প্রকল্প আরও বিস্তৃত হবে বলেই আশাবাদী সীমান্ত এলাকার মানুষ।
এই পাইলট প্রজেক্টের প্রোজেক্ট কোঅর্ডিনেটর অভিজিৎ ঘোষ বলেন, ‘আমাদের কাছে যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে বিএসএফের জানানো হয়েছিল, এখানে বেশি গরু ও মানব পাচার বেড়েছে, তখন থেকেই আমরা আয়ুষ মন্ত্রণালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় রাখি বাড়ৈকে দিয়ে গ্রামের মেয়েদেরকে ট্রেনিং দিয়ে একটা টিম রুরাল ডেভেলপমেন্ট এর উপরের জোর দিই। বিএসএফ আমাদের টিমকে খুব সহযোগিতা করেছে। তাতেই সফল। এখন প্রকল্পটি আরও বিস্তারলাভ করলে চোরা চালান কমবে। গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে বেকার যুবক যুবতীদের কর্মসংস্থানও বাড়বে।’