মহা অষ্টমীর রাতে চিল্কিগড়ের কনকদুর্গা নিজেই ভোগ রাঁধেন!
  • ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্রাম: ঘন শাল-সেগুনের জঙ্গল। পাশ দিয়ে তিরতির করে বইছে ডুলুং নদী। অরণ্যের রাস্তা পেরিয়ে সেখানেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে পাঁচশো বছরের প্রাচীন কনক দুর্গা মন্দির। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাষ্টমীর রাতে দেবী স্বয়ং মন্দিরের পাকশালায় আবির্ভূত হয়ে ভোগ রাঁধেন। দেবীর ভোগে থাকে পান্তা ভাত, মাছ পোড়া ও  শাক। থাকে  হাঁসের ডিমের ঝোলও। চিল্কিগড় বহু ইতিহাসের সাক্ষী। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, একসময় এই এলাকার নাম ছিল তিহার দ্বীপগড়। পরে চিল্কিগড় নামে পরিচিত হয়। কথিত আছে, সামন্ত রাজা গোপীনাথ সিংহ এক রাতে স্বপ্নাদেশ পান। দেবীর নির্দেশ ছিল, রানির হাতের সোনার কাঁকন দিয়ে বিগ্রহ তৈরি করে জঙ্গলের মধ্যে মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেই নির্দেশ মেনেই দেবীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠাহয়। সোনা দিয়ে বিগ্রহ নির্মাণের কাহিনি থেকেই দেবীর নাম হয় ‘কনক দুর্গা’।মহাষ্টমীর রাতের বিশেষ ভোগ রান্নার রীতিই এই পুজোর আকর্ষণ। মন্দির চাতালের নির্দিষ্ট রান্নাঘরে পুরোহিত সুচিবস্ত্র পরে প্রবেশ করেন। নতুন মাটির হাঁড়িতে নির্দিষ্ট মশলা দিয়ে ভোগ রান্না হয়। উনুনে জ্বালানো হয় ৩টি কাঠখণ্ড। শালপাতা দিয়ে হাঁড়ির মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। মন্ত্রপাঠের পর রান্নাঘরের দরজার বাইরে তালা দিয়ে বেরিয়ে আসেন পুরোহিত।  চিল্কিগড় রাজপরিবারের বর্তমান উত্তরসূরিদের হাতে চাবি তুলে দেওয়া হয়। পরদিন নবমীর সকালে চাবি নিয়ে রান্নাঘর খোলা হয়। সেই ভোগই দেবীকে নিবেদন করা হয়। যা বিরাম ভোগ নামেই প্রসিদ্ধ। ভক্তদের বিশ্বাস, অষ্টমীর রাতে দেবী নিজেই মন্দিরে এসে রান্নাঘরে ভোগ রাঁধেন! সেই বিশ্বাস ঘিরেই দূরদূরান্ত থেকে কনক দুর্গামন্দিরে ভক্তরা ভিড় জমান। তীর্থস্থান ছাড়াও কনকদুর্গা মন্দির পর্যটন হিসেবেও পরিচিত। শারদোৎসবের মরশুমে পর্যটকরা কনকদুর্গা মন্দিরে বেড়াতে আসেন। পুজোর সময় সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসে এখানে। মন্দিরের সঙ্গে চিল্কিগড় রাজবাড়িও পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। রাজ পরিবারের সদস্যরা জানালেন, প্রথা অনুযায়ী ষষ্ঠীর দিন থেকেই পুজোর সূচনা। মহাষষ্ঠীর সকালে রাজপরিবারের সদস্যরা শোভাযাত্রা করে পূর্ণঘট নিয়ে মন্দিরে যান। প্রাচীন খড়গকে রাজদণ্ডের প্রতীক মানা হয়। পুজোয় আমিষ ভোগ নিবেদনের রীতি রয়েছে। হাঁসের ডিম, নদীর মাছ-সহ বিভিন্ন পদ থাকে ভোগে। দশমীর ভোগে থাকে পান্তাভাত, শাকভাজা ও মাছ পোড়া। এছাড়াও রয়েছে বলি প্রথা। তবে তা লোকচক্ষুর আড়ালেই সম্পন্ন হয়। রাজপরিবারের বর্তমান উত্তরসূরি তেজসচন্দ্র দেও ধবলদেব বলেন, চিল্কিগড় রাজবাড়ির সঙ্গে কনক দুর্গার পুজো অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে। রাজপরিবারের উপর নানা ঝড় বয়ে গেলেও পুজো কখনো বন্ধ হয়নি।  মন্দিরের ট্রাস্ট বোর্ডের সভাপতি সমীর ধরবলেন, পুজোয় দীর্ঘ দিনের প্রথা ও রীতি পালন নিয়ে এবার কিছুটা জট তৈরি হয়েছিল।সেই জট কেটেছে। রীতি ও প্রথায় কোনো বদল আসছে না।

Advertisement