সুজয় সরকার, হিলি: আড়ম্বর বা থিমের চাকচিক্য নয়, প্রাচীন ঐতিহ্য, রীতি ও বিশ্বাস দক্ষিণ দিনাজপুরের অন্যতম প্রাচীন বালুরঘাটের হোসেনপুর এলাকার চৌধুরী পরিবারের ডাকরাচণ্ডী পুজোর মূল আকর্ষণ। স্থানীয়দের কাছে এটি জমিদার সুধীরচন্দ্র চৌধুরীর পুজো নামে পরিচিত। পরিবার সূত্রে জানা যায়, তাঁর বাবা জমিদার শশীভূষণ মণ্ডলকে ব্রিটিশ আমলে চৌধুরী উপাধি দেওয়া হয়েছিল।
প্রায় ৩৯০ বছরের প্রাচীন এই পুজোর সঙ্গে নানা লোকবিশ্বাস ও ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, একসময় হোসেনপুর এলাকা ছিল ঘন জঙ্গল এবং আত্রেয়ী নদীর প্রবাহপথ। সেই জঙ্গলে ঋষিরা পঞ্চমুণ্ডীর আসনে দেবী দুর্গার সাধনা করতেন। পরে সেই সাধনাস্থান মাটির নীচে চাপা পড়ে যায়। পরিবারের পূর্বপুরুষ রামচন্দ্র মণ্ডল স্বপ্নাদেশ পেয়ে সেই আসন উদ্ধার করেন এবং দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। পরবর্তীতে ডাকরা মৌজা ও চণ্ডী সাধনার যোগসূত্রে দেবী ডাকরাচণ্ডী নামে পূজিতা হন।
জন্মাষ্টমীতে কাঠামো পুজোর মধ্য দিয়ে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের রীতি মেনে প্রতিমা তৈরিতে পেরেক ব্যবহার করা হয় না। বাঁশ, খড় ও আঠা দিয়ে তৈরি হয় প্রতিমার কাঠামো। প্রতিবছর নতুন কাঠামোয় ডাকের সাজে প্রতিমা তৈরি করা হয়। মহাষষ্ঠীতে প্রতিমায় রং ও চক্ষুদান করা হয়। একসময় এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত মৃৎশিল্পী, পুরোহিত, জোগাড়ি, ভোগ রান্নার ঠাকুর এবং ঢাকিরাও বংশপরম্পরায় দায়িত্ব পালন করতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সেই রীতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে।
বৈষ্ণব মতে আয়োজিত এই পুজোয় দিনে দেবীকে মিষ্টি, পায়েস, লুচি ও ফলের ভোগ দেওয়া হয়। রাতে দেওয়া হয় নিরামিষ অন্নভোগ। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে যথাক্রমে সাত, আট ও নয় রকম ভাজা দিয়ে দেবীকে ভোগ নিবেদন করা হয়। ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধ্যায় মঙ্গলচণ্ডীর পালাগান পরিবেশিত হয়। মহাষ্টমীতে পুষ্পাঞ্জলি দিতে মণ্ডপে ভক্তরা ভিড় করেন। দশমীর সকালে বিশেষ রীতি মেনে মণ্ডপ প্রাঙ্গণে হয় আগুন নাচ ও চামুণ্ডার মুখা নৃত্যের আয়োজন করা। এরপর চৌধুরী বাড়ির সামনে দেবীকে বরণ করে আশীর্বাদ নেন স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদের কাঁধে করে আত্রেয়ী নদীতে দেবী প্রতিমা বিসর্জনের নিয়ে যাওয়া হয়। তবে একসময় বিসর্জনের আগে নৌকায় করে প্রতিমাকে নদীতে সাত পাক ঘোরানোর রীতি ছিল। ১৯৯০ সালের পর থেকে সেই রীতি বন্ধ হয়ে যায়।
চৌধুরী পরিবারের বর্তমান সদস্য সুপ্রিয় কুমার চৌধুরী এখন পুজোর আয়োজনের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বলেন, আজও প্রাচীন রীতি ও পরম্পরা মেনে সমস্ত পুজোর আয়োজন করা হয়। এটি তাদের পারিবারিক পুজো হলেও পুজোর ক’টা দিন বহু মানুষ পুজোতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। আগামীতেও সবাইকে নিয়ে পুজোর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান।



