সুখেন্দু পাল, গলসি: দেশজুড়ে তখন ভারতমাতাকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। ইংরেজদের দমনপীড়ন উপেক্ষা করেই একঝাঁক দেশপ্রেমী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। গোপন বৈঠক করে চলছে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্তুতি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গোপন আস্তানা তৈরি করছে তারা। সেরকম একটি গোপন ডেরা ছিল গলসির চান্না আশ্রম। বটুকেশ্বর দত্ত, যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাসবিহারী বসু ঘনঘন সেখানে বৈঠক করেছেন। দিনরাত সব সময়ই চলত নানা আলোচনা। খড়ি নদীর পাড়ে নির্জন এলাকা। চারদিক জঙ্গলে ভর্তি। সেখানে পৌঁছতে বেগ পেতে হয়। ইংরেজ বাহিনীর নজর সেখানে পড়েনি। সেই কারণে দিনের পর দিন সেখানেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার ব্লু-প্রিন্ট ঠিক হলেও কেউ টের পায়নি। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর স্বাধীনতা এসেছে। উন্নত ভারত এগিয়ে চলছে। কিন্তু, চান্না গ্রামের সেই আশ্রমের কথা আর কেউ মনে রাখেনি। অবহেলায় পড়ে রয়েছে একসময়ের বিপ্লবীদের আস্তানা। মাটির ঘরটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তবে সেটা কতদিন মাথা তুলে থাকবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, যে কোনও দিন ইতিহাসের এই স্মৃতি ধুলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। তখন আক্ষেপ করা ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। অথচ এখানেই তৈরি হতে পারত পর্যটন কেন্দ্র। ইতিহাসের সন্ধানে ইতিহাসবিদরা মাঝেমধ্যেই এই গ্রামে ঢুঁ মারেন। একরাশ অভিমান নিয়ে তাঁরা ফিরে যান। গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, চান্না আশ্রমকে ঘিরে বহু পরিকল্পনার কথা বছরের পর বছর শুনে আসছি। বিপ্লবীদের আস্তানা সংস্কার করা হবে বলে শুনেছিলাম। কিন্তু, সেসব কিছুই হয়নি। এই আশ্রমের অবদানের কথা ভুলে গেলে অন্যায় হবে। পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসক আয়েশা রানি এ বলেন, কিছুদিনের মধ্যেই ওই গ্রামে পরিদর্শনে যাব। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এই জেলাতেই রাসবিহারী বসু, বটুকেশ্বর দত্তের মতো দেশপ্রেমিকরা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের গ্রামেও বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বটুকেশ্বর দত্তের গ্রামে উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে তৈরি করা হয়েছে গোপন আস্তানা। এছাড়া জেলার অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রগুলিও সাজিয়ে তোলা হবে। সেই তালিকায় চান্না গ্রামও থাকবে। গলসির বাসিন্দা শৈলেন হালদার বলেন, চান্না আশ্রম আমাদের কাছে গর্বের জায়গা। এই আশ্রমে বহু স্বাধীনতা সংগ্রামের পদধূলি পড়েছিল। আমরাও চাই গ্রামের উন্নয়ন হোক। স্থানীয়রা বলেন, জেলার বাইরে থেকে বহু দূরদূরান্তের বাসিন্দা এই আশ্রম দেখতে আসেন। এই অবস্থায় বাড়িটি পড়ে থাকতে দেখে তাঁদের ভালো লাগে না। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মর্যাদা দিয়ে এই আশ্রম ঢেলে সাজা হোক। তুলে ধরা হোক এই আশ্রমের মাহাত্ম্যের কথাও।



