রঙ্গন বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: চোখে ঘুম নেই বসন্তর। দিনরাত কেবল মা, মা করে। আদিগঙ্গার খালে জোয়ার খেলছে। চাঁদনি ঘাটে উপচে পড়ছে জল। জঙ্গলে ঘেরা বেলগাছের তলায় কঠোর সাধনায় রত চটধারী বসন্ত ঠাকুর। একদিন সিদ্ধিলাভ হল। মা দক্ষিণাকালী স্বপ্নাদেশে বসন্তকে আদেশ করলেন, তুই বেনারস যা। সেখানে আমার একটি মূর্তি আছে। সেটি এখানে এনে পুজো শুরু কর। আদেশ পেয়ে কয়লাচালিত ইঞ্জিনের রেলগাড়িতে চেপে বসন্ত ছুটলেন বেনারস। স্বপ্নাদিষ্ট স্থান থেকে কষ্টিপাথরের কালীর অপরূপ মূর্তিটি সংগ্রহ করে আড়াই দিনের রেলযাত্রার ধকল সয়ে ফিরলেন। ১৯০ বছর আগে গড়িয়া তখন ঘন জঙ্গলে ঢাকা। সেখানে আদিগঙ্গার পাশে হোগলা ও তালপাতা দিয়ে ছোটো কুটির বানিয়ে কালীকে প্রতিষ্ঠা করলেন। ঠাকুরের নাম দিলেন ‘বাসনা কালী’। কঠিন রোগমুক্তি, পরীক্ষায় ভালো ফল, মামলা-মোকদ্দমায় সাফল্যর আকাঙ্খাপূরণ থেকে শুরু করে মন্দিরে চুরি করতে আসা চোরকে আটকে রাখার মতো বহু অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন বাসনা কালী।
গড়িয়ার কামডহরি পূর্বপাড়া এলাকায় রয়েছে মন্দিরটি। দু’শো বছর আগের কষ্টিপাথরের বিগ্রহটিই রয়েছে। বসন্ত ঠাকুরেরই পরবর্তী প্রজন্ম মায়ের সেবায়েত। মন্দিরের বর্তমান পুরোহিত সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘মন্দিরের জমি আমাদের হলেও এখানে আমরা কেউ থাকি না। কারণ স্বয়ং কালীর এখানে যাতায়াত। বাবা, ঠাকুরদাদারা মন্দিরের বাগানে মায়ের অস্তিত্ব অনুভব করেছিলেন। রাতে কালো রংয়ের এক নারী লালপেড়ে শাড়ি, গয়না ও নূপুর পরে বাগানে ঘোরাফেরা করছিলেন তা দেখেছিলেন আমার বাবা পূজারি প্রভাত বন্দ্যোপাধ্যায়। আমিও মন্দিরের বিভিন্ন প্রান্তে মায়ের নূপুরের ধ্বনি শুনেছি।’ তিনি জানান, একবার তো গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো একটি ঘটনা ঘটেছিল। সাতের দশকে ঠাকুরের প্রণামী বাক্স থেকে পয়সা ও বাসন চুরি করতে ঢুকেছিল এক চোর। সে মন্দিরেই আটকা পড়ে। এ লীলা মায়েরই। শেষমেশ বিগ্রহর পা ছুঁয়ে কাঁদতে কাঁদতে ক্ষমা চেয়ে পরিত্রাণ পেয়েছিল চোরটি।
কড়ি, বরগার নির্মাণ ভেঙে দু’বছর হল নতুন মন্দির হয়েছে। বিপরীতে আদিগঙ্গা। সেখান থেকে ঘটে জল নিয়ে কালীর পুজো হয়। প্রতি অমাবস্যায় হয় অন্ন ভোগ। বাসনা কালীর আরাধনা বৈষ্ণব মতে। বহু ভক্ত মনষ্কাম পূরণ হওয়ার পর মন্দিরে রাধাকৃষ্ণ, গণেশ, শিবলিঙ্গ, মনসা, নারায়ণ প্রভৃতি দেব, দেবীর বিগ্রহ দান করেন।



