গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভ হল—লেজিসলেভি, এগজিকিউটিভ, জুডিশিয়ারি এবং মিডিয়া। অর্থাৎ প্রথম স্তম্ভটি হল আইনসভা, যেখানে আইন প্রণয়ন হয়। দ্বিতীয়টি হল প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি-সহ সরকার এবং আমলাতন্ত্র। অর্থাৎ যাদের মাধ্যমে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পায়। তিন নম্বরে বিচারবিভাগ। বিচারব্যবস্থা আইনের ব্যাখ্যাসহ বিবাদসমূহের নিষ্পত্তি করে। সংবিধান এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষার জন্যই আদালতের এই অনবদ্য ভূমিকা। বিচারবিভাগকে এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয় পূর্ণ স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং সাহসিকতার সঙ্গে। মনে রাখতে হবে বিচারবিভাগ একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। এটি বাদী বিবাদী সরকার বিরোধী কারো নয়, একমাত্র সংবিধানের কাছেই দায়বদ্ধ। গণতন্ত্রের চতুর্থ বা শেষ স্তম্ভটি হল মিডিয়া। সংবাদ মাধ্যমের কাছে স্বচ্ছতা এবং সার্বিক নিরপেক্ষতা কাম্য। তারাও কারো পক্ষ নিতে পারে না, কোনো বিষয়ে মত দিতে পারে না, জনমত গঠনে সহায়কের ভূমিকা নিতে পারে মাত্র। সেই অর্থে মিডিয়া হল দর্শক বা সাক্ষী—সে যা দেখে ও শোনে সেটাই দায়িত্বজ্ঞানের সহিত পরিবেশন করে। বলা বাহুল্য, গণতন্ত্রের এই স্তম্ভগুলির পরিধি চিহ্নিত। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তারা কিছু স্বাধীনতাও ভোগ করে। তবে বহু ক্ষেত্রেই চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মতের অমিল পরিলক্ষিত হয়। এমনকি উপস্থিত হয় আইনি বিবাদও। তখন তার নিষ্পত্তির দায়িত্ব বর্তায় আদালতের উপর।
ভারতই পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র। কিন্তু আমাদের গণতন্ত্রের মানোন্নয়নের এখনো অনেক সুযোগ রয়েছে। বিপুল ঘাটতি খামতির জন্যই বৃহত্তম হয়েও ভারতীয় গণতন্ত্র তার প্রাপ্য মর্যাদা পায় না। বিশেষ করে পশ্চিমা দুনিয়া, যেখানে গণতন্ত্র অনেক শক্তিশালী, ভারতকে ইলেক্টোরাল অটোক্রেসির ঊর্ধ্বে গুরুত্ব দিতে নারাজ। এর জন্য দায়ী আমাদের বহুদলীয়, সংসদীয় ব্যবস্থার অজস্র ত্রুটি। সর্বাধিক পীড়াদায়ক হল রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন। এই কারণেই নির্বাচিত সরকারগুলি আটদশকেও দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণে সফল হয়নি। দেশজুড়ে জারি রয়েছে বিভেদের রাজনীতি এবং রকমারি বৈষম্য। ভারতীয় গণতন্ত্রের আরেকটি ব্যাধির নাম দুর্নীতি। নেতা-মন্ত্রী থেকে সরকারি আমলাদের একটি বৃহৎ অংশ এতে নিমজ্জিত। প্রতিটি নির্বাচনে দুর্নীতিই প্রধান ইস্যু হয়, কিন্তু তা মিলিয়ে যেতেও সময় নেয় না। দুর্নীতি এবং দুর্বৃত্তায়নের বহু বিবাদ নিম্ন আদালত থেকে শীর্ষ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালত উষ্মা প্রকাশ করে, ভর্ৎসনা করে, কড়া রায়ও দেয় অনেক ক্ষেত্রে। কিন্তু দিনের শেষে সুরাহা মেলে কমই। ফলে এই সকল ব্যাধি ক্রনিক আকার নেয়। আদালত রায় দিতে পারে, কিন্তু তা কার্যকর করার দায়িত্ব হল প্রশাসনের। পরিতাপের বিষয় হল, প্রশাসনকে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকায় পাওয়া যায় ক্বচিৎ। বলা ভালো, আদালত অবমাননাকেই বাহাদুরি হিসেবে জাহির করতে দেখা যায় অনেকসময়। মিডিয়াকেও বহু ক্ষেত্রে যথোচিত ভূমিকায় পাওয়া যায় না বলে ‘গোদি মিডিয়া’ কটাক্ষ চালু রয়েছে। অর্থাৎ লেজিসলেভি, এগজিকিউটিভ এবং মিডিয়া গণতন্ত্রকে উন্নত করার দায়িত্ব যে যথাযথভাবে পালন করছে না, তা পরিষ্কার। বিশেষ করে সরকার সেই দায় স্বীকার করার বদলে আদালত এবং মিডিয়ার দিকেই আঙুল উঁচিয়ে রাখে বেশিরভাগ সময়।
রাজনীতির ময়দান, নির্বাচনি প্রচার মঞ্চ হলে তো কথাই নেই, এই দুই স্তম্ভকে নিশানা করা হয়। এবার দেখা গেল মোদি সরকার পূর্বাপর রেকর্ড ভাঙায় ব্যগ্র হয়ে উঠেছে। দেশের বিচারব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবার জন্য বেছে নিয়েছে স্কুলপাঠ্য বইকে! অষ্টম শ্রেণির সোশ্যাল সায়েন্স বইয়ে ‘বিচারবিভাগে দুর্নীতি’র মতো অধ্যায় রাখা হয়েছে। এই অভূতপূর্ব কীর্তি শিক্ষামন্ত্রকের অধীন সংস্থা এনসিইআরটির! সেখানে আলাদাভাবে উল্লেখিত হয়েছে সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের বিভিন্ন আদালতে ক্রমাগত জমতে থাকা মামলার পাহাড়ের প্রসঙ্গও। ভাবা যায়, কোমলমতি ছেলেমেয়েদের মনেও আদালত বা বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে! অথচ, বিচারব্যবস্থাই এখনো পর্যন্ত দেশবাসীর শেষ ভরসা। রাজনীতির কারবারি, সরকার, প্রশাসন প্রভৃতি যখন অনাচার রুখতে ব্যর্থ, এমনকি বহুক্ষেত্রে স্বয়ং মদতদাতা, তখন নিপীড়িত মানুষের আদালত ছাড়া যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকে না। মোদি সরকার আঘাত হানার চেষ্টা করেছে সেই পবিত্র স্থানেই। স্বভাবতই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, ‘যত বড়ো প্রভাবশালীই হোন, এই প্রতিষ্ঠানের অবমাননা আমি করতে দেব না।’ সরকার বিরূপ জনমতও টের পেয়েছে নিশ্চয়। অবশেষে তারা এই কীর্তির জন্য ক্ষমাপ্রার্থনাসহ বিতর্কিত অধ্যায় বাদ দিয়ে বইটি নতুন করে ছাপার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। তবে এ কোনো ‘অনিচ্ছাকৃত’ ভুল নয়, এটা গেরুয়া সংস্কৃতির অঙ্গ। সরকারের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকার নিন্দার ভাষা সত্যিই কম পড়ে যায়।