নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘অনুশাসন’ নির্ধারণের বৈঠক। এই আঙ্গিকেই ছিল প্রচার। আর পুজো কমিটিগুলির সঙ্গে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সেই আলোচনায় সামনে এল কয়েকটি ‘নিদান’। দুর্গাপুজোয় মণ্ডপ চত্বরে এবার আমিষ বন্ধের নিদান বিশ্ব হিন্দু পরিষদের! এমনকি করা যাবে না থিমের পুজো, ফিরতে হবে সবেকিয়ানায়—পুজো কমিটিগুলির সঙ্গে বৈঠকে এমন নানা বার্তা দিল হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) দাবি, আমিষ বা নিরামিষ প্রসঙ্গে কিছু বলা হয়নি। মণ্ডপের ‘শুচিতা’ বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি, তাঁদের বার্তা, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই স্লোগান আর নয়। বলতে হবে, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব তার তার’! এ কথা শুনে এক পুজোকর্তা এমনও বলেন, আমাদের বাংলায় খিদিরপুরে সংখ্যালঘু মানুষ কয়েক দশক ধরে দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িত। সেখানে কী করব?
সম্প্রতি সল্টলেকে বিভিন্ন পুজো কমিটিকে ডেকে পাঠিয়েছিল ভিএইচপি। পুজো কমিটিগুলির দাবি, ‘অনুরোধ’ করা হয়েছে, কোনো থিমের পুজো নয়। মাতৃমূর্তি হতে হবে সাবেকি। প্রতিমা তৈরির সময় ফটোশ্যুট চলবে না। কুমোরটুলিতে মায়ের ছবি পর্যন্ত তোলা যাবে না। মণ্ডপের ভিতর আমিষ না ঢোকানো এবং মণ্ডপের বাইরে আমিষ বিক্রি না করার ‘আবেদন’ জানানো হয়েছে। প্যান্ডেল করতে হবে সনাতনী সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে। বিকৃত কিছু দেখলে পুজো বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ভিএইচপির এই বার্তাগুলি ‘পুজো পরিবার’ নামক একটি সংগঠন তাদের ফেসবুকে পোস্ট করে। তারপরই সমাজমাধ্যমে বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। বাঙালির দুর্গাপুজোয় ভিএইচপির এই ‘অনুশাসন’ নিয়ে ক্ষুব্ধ নাগরিক মহলের একাংশ। দক্ষিণ কলকাতার শিবমন্দির পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা পার্থ ঘোষ বলেন, ‘মণ্ডপের ভিতরে কেউ আমিষ খেতে খেতে ঢোকে, এমন ভাবনাটা ঠিক নয়। বাইরে যে আমিষ বা নিরামিষ স্টল দেওয়া হয়, সেটাও অগ্নি সুরক্ষাবিধির কথা চিন্তা করে মণ্ডপের থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে।’ তাঁর সংযোজন, ‘পুজোর আয়োজন আগের বছর থেকে শুরু হয়ে যায়। এখন থিমের পুজো করা যাবে না বললে সঙ্গে সঙ্গে তা বদল করা সম্ভব নয়। তাছাড়া থিম মানেই শিল্পশৈলী। মানুষ সেই শিল্পকর্ম দেখতেই মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড় জমান। যেখানে শিল্পকর্ম রয়েছে, সেখানে ভক্তি নেই—এমন ভাবনা সঠিক নয়। আমাদের পুজোর সঙ্গে ধর্ম, আবেগ, থিম সবটাই মিলেমিশে রয়েছে। তাই বাঙালির দুর্গাপুজো অনন্য।’ ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন উকিল অবশ্য জানিয়েছেন, ‘আগামী ৭ সেপ্টেম্বর পুজো নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার কথা শুনছি। মুখ্যমন্ত্রী কী বার্তা দেন, তার অপেক্ষায় আছি আমরা। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বিষয়গুলি নিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করব। প্রশাসন কী চাইছে, সেটাও আমাদের জানতে হবে।’
এহেন নিদানে তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। বহু জায়গাতেই শাক্ত মতে মায়ের পুজো হয়। অনেকেই অষ্টমীতে নিরামিষ আহার করলেও বাঙালির কাছে নবমী মানেই ‘পাঁঠার ঝোল’, ভূরিভোজ। ধর্মীয় রীতির প্রসঙ্গে প্রাচ্য বিদ্যা আকাদেমির জয়ন্ত কুশারি বলেন, ‘কিছু বৈষ্ণব পরিবারে মাকে নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয়। তবে, তন্ত্রোক্ত মতে দেবীপুজোয় বলিদান ও আমিষ ভোজ্য উপাদান দেবীকে নিবেদনই পুজোর রীতি। শাস্ত্র মেনেই এই রীতি চলে আসছে। স্বাভাবিকভাবে তাই মণ্ডপে আমিষ ঢোকে। দেবীকে নিরামিষ ভোগ নিবেদনের প্রস্তাব বাংলার দুর্গাপুজোর সংস্কৃতির সঙ্গে মেলে না। এটা এতদিনের পরম্পরাতেই হস্তক্ষেপ। বাঞ্ছিত নয়।’
যদিও ভিএইচপির অমিয় সরকারের দাবি, ‘আমিষ নিয়ে সভায় প্রসঙ্গ উঠেছিল। কিন্তু আমিষ খাওয়া যাবে না, এমন কিছু আমরা বলিনি। এটা কিছু মানুষ বিভ্রান্তিমূলক প্রচার করছে। আমরা শুধু বলেছি, মণ্ডপের শুচিতা বজায় রাখতে হবে। পবিত্রতা যেন নষ্ট না হয়। যা খুশি তাই খাওয়া-দাওয়া করে মণ্ডপের ভিতর এবং চারিদিকে নোংরা করে রাখবে, সেটা যেন না হয়।’