নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: সালকিয়ার ধর্মতলা বাজারের চক্রবর্তী বাড়ির দুর্গাপুজোয় উমা একা আসেন না। আগমনের পথে তাঁকে স্বাগত জানান ভবতারিণী। স্থানীয় কালীমন্দিরে সারাবছর অধিষ্ঠান ভবতারিণীর। মানুষের বারোমাস্যায় তিনিই সহায়। শারদীয়াতেও চক্রবর্তীদের আরাধ্যা তিনি।
এই পরিবারে দুর্গাপুজোর সময় কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা আনার পর, সরাসরি বাড়িতে ঢোকেন না দেবী। আগে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় কালী প্রতিমার সামনে। সেখানে মুখোমুখি কিছুক্ষণ অধিষ্ঠান করেন দুর্গা। তারপর সপরিবারে প্রবেশ করেন চক্রবর্তী বাড়ি। ডাকের সাজে সাজেন দেবী। দেড়শো বছরেরও বেশি প্রাচীন এই বাড়ির পুজোর এটাই নিয়ম, এটাই ঐতিহ্য। এই যোগ এখানেই শেষ নয়। বাড়ির কর্তা তনুজ চক্রবর্তী বলেন, ‘মায়ের ভোগের প্রথম ভাগ যায় ভবতারিণীর কাছে। সপ্তমীতে খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা, তরকারি আর পায়েস। অষ্টমীতে লুচি, দু’রকম তরকারি আর চালের পায়েস। নবমীতে পোলাও, তরকারি ও পায়েস। বাড়িতে যাই রান্না হোক আগে নিবেদন করা হয় কালীমন্দিরে, তারপর তা পরিবেশন করা হয় দুর্গাকে।’ তনুজবাবু জানান, মাঝে বহুবছর বন্ধ থাকার পর সকলের ইচ্ছায় আবার নতুন করে শুরু করেছেন পুজো।
এখন পুজোর সবক’টি দিন কয়েকশো মানুষের পাত পড়ে। সবার জন্য থাকে আহারের ব্যবস্থা, সঙ্গে ভোগের প্রসাদও। সন্ধিপুজোয় চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়, সেই প্রসাদও বিলিয়ে দেওয়া হয় ভক্তদের মধ্যে। তনুজবাবু বলেন, ‘আমি কালীমন্ত্রে দীক্ষিত। তাই পুজোর সংকল্পে আমিই বসি। কুমারীপুজো, হোম সবটাই নিজে হাতে করি।’ এই বাড়ির কুমারীপুজো ঘিরে আলাদা উন্মাদনা। নবমীতে বেনারসি শাড়ি, গয়না আর ফুলে সাজানো হয় কুমারীকে। তাকে দেখতে ভিড় জমান সকলে। একইসঙ্গে এদিন একজন সধবা নারীকেও পুজো করা হয়। শাড়ি, আলতা, সিঁদুর আর মিষ্টির থালা দিয়ে তাঁকে বরণ করা হয়। পৌরহিত্যের মূল দায়িত্বে সুকান্ত চক্রবর্তী। চণ্ডীপাঠ করেন অরিজিৎ চক্রবর্তী। বাড়ির নতুন প্রজন্মের সদস্য মৈত্রেয় চক্রবর্তী বলেন, ‘আমাদের পুজোয় তিনটি ঘট বসে, দেবীর ঘট, চণ্ডীর ঘট আর গণেশের ঘট। পরিবারের পুরুষরা সেই ঘট নিয়ে যান গঙ্গায়।’ মায়ের মূল ঘট ডোবানোর গুরুদায়িত্ব থাকে মৈত্রেয়’র উপর। আর দশমীর রীতি সবচেয়ে অন্যরকম। দেবী বরণের আগে বাড়ির উনুন সহ সমস্ত আগুন নিভিয়ে দেওয়া হয়। কেউ উপবাস ভাঙেন না। বরণ আর বিসর্জন সম্পূর্ণ হওয়ার পরই উনুন জ্বলে। তখনই উপবাস ভাঙেন সদস্যরা। খালি পেটে, না খেয়ে মায়ের কাছে সকলের একটাই আবদার থাকে, ‘আবার এস মা আনন্দময়ী, মঙ্গল করো সকলের।’