প্রীতেশ বসু, কলকাতা: যত দিন যাচ্ছে, ততই তীব্র হচ্ছে বেকারত্বের জ্বালা। হাজার চেষ্টা চালিয়েও এমন কোনো কাজ বা চাকরি জোটানো যাচ্ছে না, যাতে বাড়িতে থেকে, মা-বাবার দেখভাল করে সংসার চালানো যায়। অগত্যা পাড়ি দিতে হচ্ছে ভিন রাজ্য বা বিদেশে। বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখভালের কেউ থাকছে না। এক-একটা পাড়া যেন আস্ত বৃদ্ধাশ্রম! এই আর্থ-সামাজিক সংকট ভারতে আজকের দিনে কতটা বাস্তব, সেটাই স্পষ্ট হয়ে গেল নীতি আয়োগের সম্প্রতি প্রকাশিত রিপোর্টে। তবে শুধু সমস্যা চিহ্নিত করাই নয়, সমাধানের জন্য কিছু পরামর্শও দেওয়া হয়েছে ‘রিইমাজিনিং কেয়ার: স্ট্র্যাটেজিস ফর এমপাওয়ারিং কেয়ারগিভার্স ইন বিকশিত ভারত, ২০৪৭’ শীর্ষক ওই রিপোর্টে। এক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় নীতি প্রণয়নের জন্য সওয়াল করা হয়েছে সেখানে। তিনটি অবিজেপি শাসিত ও একটি বিজেপি শাসিত রাজ্যের কিছু প্রকল্পকে উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরেছে তারা।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতে ষাটোর্ধ্ব প্রবীণের সংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ৯০ লক্ষ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১০.৫ শতাংশ। পরিসংখ্যানবিদদের অনুমান, ২০৩১ নাগাদ এই সংখ্যা ১৯ কোটি ৪০ লক্ষ ছুঁতে পারে। আর ২০৫০ সাল নাগাদ ভারতে এমন প্রবীণদের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৩৪ কোটি ৭০ লক্ষ, যা সেই সময়ের সম্ভাব্য জনসংখ্যার ২০.৮ শতাংশ। জনবিন্যাসের এই তথ্য থেকে স্পষ্ট, আগামী দিনে দেশের প্রবীণ নাগরিকদের যথাযথ দেখভাল, তাঁদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখার মতো কাজগুলি (কেয়ার গিভিং) গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এদেশে ঐতিহ্যগতভাবে বয়স্কদের দেখভাল করে আসছে পরিবারের সদস্যরাই। যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকলেও ভারতীয় পরিবার কাঠামোয় ছেলে-মেয়েরাই সাধারণত বাড়ির বয়স্কদের যত্ন নেয়। আর সেখানেই দেখা দিয়েছে সংকট! যার অন্যতম কারণ, বেকারত্বের জ্বালায় তরুণ-তরুণীদের বাড়িঘর ছেড়ে ‘পরিযায়ী’ হওয়া। আরও কয়েকটি কারণও রয়েছে। তাছাড়া, যৌথ পরিবার ভেঙে তৈরি হচ্ছে ‘নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি’। স্বামী-স্ত্রী, তাঁদের এক বা দুই সন্তান নিয়ে ‘সুখী সংসার’! সেই পরিবারে প্রবীণদের জায়গা কোথায়! ফলে আগামী কয়েক দশকে প্রবীণ নাগরিকদের দেখভালের জন্য প্রশিক্ষিত ‘কেয়ারগিভিং’ পরিষেবার চাহিদা বাড়বে। তাই এ বিষয়ে জাতীয় স্তরে একটি সুস্পষ্ট নীতি প্রণয়ন, তার ভিত্তিতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে আশু সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে করছে ভারতের নীতি আয়োগ। আর এক্ষেত্রে তারা দৃষ্টান্ত হিসাবে দেশের চারটি রাজ্যের কথা তুলে ধরছে। কর্ণাটক, কেরালা, তামিলনাড়ু ও বিজেপি শাসিত ওড়িশা।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, কেয়ারগিভিংয়ের ক্ষেত্রে জাতীয় নীতি প্রণয়ন করতে হবে। দেখভালের কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও তাঁদের কাজের জন্য পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্য সুসমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। এখানেই নীতি আয়োগ চারটি রাজ্যের কিছু প্রকল্প বা উদ্যোগ তুলে ধরেছে। যেমন, ২০২৪ সালে তামিলনাড়ুর ৩৬টি সরকারি
মেডিকেল কলেজে চালু হয়েছে ‘হোম বেসড এল্ডারলি কেয়ার সাপোর্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট’ কোর্স। কর্ণাটক সরকার বিনা বেতনের কেয়ারগিভারদের জন্য মাসিক ভাতা চালু করেছে।
সেখানে এই কাজে যুক্ত করা হয়েছে সেখানকার স্বনির্ভর গোষ্ঠগুলিকেও। কেরালা ও ওড়িশার সরকার বিশেষ পাঠ্যক্রম চালু সহ একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান অশোক লাহিড়ি বলেন, ‘প্রবীণদের দেখভালের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজ্য ও দেশের নীতি গ্রহণ ও তা রূপায়ণের ক্ষেত্রে এই রিপোর্ট বিশেষভাবে সাহায্য করবে।’