নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: যত দিন গড়াচ্ছে জাহিরের সম্পর্কে নিত্য নতুন তথ্য সামনে আসছে। হাসপাতালে কোনও মহিলা অস্থায়ী কর্মী গর্ভবতী হতে চাইলে নাকি জাহির আব্বাস খানের অনুমতি নিতে হতো। এমন নিদানও দিয়েছিল ধর্ষণের ঘটনায় ধৃত ফেসিলিটি ম্যানেজার। জাহিরের কোপে এক বছর আগে পাঁশকুড়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের এজেন্সির কাজ খুইয়েছেন টুম্পা হাঁসদা। উত্তর মেচগ্রামের ওই মহিলা সফাইয়ের কাজ করতেন। গর্ভবর্তী হওয়ার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। গর্ভপাত হয়ে যাওয়ার কারণে কিছুদিন তিনি ডিউটিতে যেতে পারেননি। তাতেই চটে লাল জাহির। ঘরভর্তি লোকজনের সামনে ওই মহিলাকে জাহির বলেছিল, পেটে বাচ্চা নেওয়ার সময় অনুমতি নিয়েছিলে? ওই মহিলা উত্তরে বলেছিলেন, আমার কাজ নিয়ে যা প্রশ্ন করতে পারেন। কিন্তু, ব্যক্তিগত বিষয়ে কোনও মন্তব্য করবেন না। এই বলায় ক্ষেপে গিয়ে জাহির তাঁকে কাজ থেকে ছাঁটাই করে দেয়।
২০১০-১১ সাল নাগাদ গাড়ি চালক হিসেবে পাঁশকুড়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে এন্ট্রি নিয়েছিল জাহির। হাসপাতালের এক মহিলা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের গাড়ি চালাত। তারপর ধীরে ধীরে ওই হাসপাতালে নিজের গাড়ি ভাড়ায় খাটাতে শুরু করে। এভাবেই তার পাঁচটি গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে চুক্তিতে চলত। হাসপাতালের ভিতর অ্যাম্বুলেন্স ও গাড়ির একটা সিন্ডিকেট বানিয়ে ফেলেছিল। তারই এক ঘনিষ্ঠের মারধরের জেরে ২০২২ সালের জুন মাসে ওই হাসপাতালের একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চাকরি ছেড়ে চলে যান। এভাবে জাহির ও তার টিমের দাদাগিরি চললেও কর্তৃপক্ষ কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। হাসপাতালে ১০২ মাতৃযান থাকা সত্ত্বেও সেই গাড়ির বদলে জাহিরের অ্যাম্বুলেন্সে সন্তানসম্ভবা মায়েদের বাড়ি থেকে হাসপাতালে আনা ও ফেরত পাঠানো হতো। হাসপাতালের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনার পর পাঁশকুড়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের নজরদারির বেহাল ছবিটা সামনে এসেছে। প্রিভেনশন অব সেক্সসুয়াল হ্যারাসমেন্ট(পিওএসএইচ) কমিটি খাতায় কলমে থাকলেও তারা নিষ্ক্রিয় ছিল। গোটা হাসপাতালের কোথাও কমিটির পক্ষ থেকে একটাও সতর্কতামূলক ব্যানার লাগানো নেই। একই অবস্থা ইন্টারনাল কমপ্লেন কমিটিরও(আইসিসি)। হাসপাতালে মার খেয়ে চিকিৎসক চাকরি ছাড়লেও কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার নজির নেই। জাহিরের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ১৪-১৫ জন এজেন্সি কর্মী কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। ইন্টারন্যাল কমপ্লেন কমিটির ভূমিকা ধৃতরাষ্ট্রের মতো। তাছাড়া, পাঁচতলার হাসপাতালে সিসি ক্যামেরা মাত্র ৫০টি। আরজি কর হাসপাতালের ঘটনার পর আরও ৫০টি সিসি ক্যামেরার জন্য কর্তৃপক্ষ জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের কাছে সুপারিশ করলেও তা মঞ্জুর হয়নি। শনিবার জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্যা অচর্না মজুমদার পাঁশকুড়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল ভিজিট করেন। তিনি হাসপাতাল ঘুরে দেখার পাশাপাশি সুপার, অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারের সঙ্গে বৈঠক করেন। নিগৃহীত স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি এজেন্সি নিযুক্ত অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গেও কথা বলেন। তিনি বলেন, সর্ষের মধ্যেই ভূত ছিল। বাইরে থেকে ভূত আসেনি। সেই ভূত এখানে লালিত পালিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই হাসপাতালে জাহিরের কর্তৃত্ব চলছে। তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে পারত না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ধর্ষণের মতো ঘটনা এই প্রথম নয়। ধারাবাহিকভাবে এটা হয়ে আসছিল। এখানে ৪১ জন এজেন্সির মহিলা কর্মী আছেন। তাঁদের অধিকাংশই আমার কাছে অভিযোগ করেছেন। রোগী কল্যাণ সমিতি এই সিন্ডিকেট নিয়ে কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।