


গোটা দেশ জানে, মাছ-মাংস-ডিমের মতো আমিষ খাবার বিজেপির বিলকুল পছন্দ নয়। আমিষ হটাও, নিরামিষ খাও— এই হল গেরুয়া শিবিরের অলিখিত স্লোগান। বছর কয়েক আগে কেন্দ্র-নিয়ন্ত্রিত পুলিশ আপত্তি তোলায় পূর্ব দিল্লির এক দুর্গাপুজোর মণ্ডপ চত্বর থেকে এগরোল, ফিস ফ্রাই, মাংসের চপ বিক্রি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল! বছর দুয়েক আগে মধ্যপ্রদেশের বিজেপি মন্ত্রিসভা ফরমান জারি করে জানায়, খোলা বাজারে মাছ-মাংস-ডিম বিক্রি করা যাবে না। তারও আগে কয়েকটি রাজ্যে স্কুলের মিড ডে মিলে ডিম বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুধু দিল্লি বা মধ্যপ্রদেশ নয়, মোদি জমানায় উত্তর ও পশ্চিম ভারতের আমিষের উপর নিষেধাজ্ঞার চেহারাটা মোটামুটি একই। গুজরাতের একাধিক শহরে প্রকাশ্যে আমিষ খাওয়া বা বিক্রি করা যায় না। হিন্দু মন্দির সংলগ্ন স্থানে মাছ-মাংস বন্ধে প্রশাসনিক ফতোয়া জারি বা গেরুয়া তাণ্ডবের ঘটনা নতুন নয়। আইন করে আমিষ খাবার খাওয়া বা বিক্রি বন্ধ— তাও জারি আছে কোনো কোনো রাজ্যে। এমনকি মসজিদ চত্বরেও আমিষ বন্ধের ফতোয়া জারি আছে বিজেপি শাসিত কোনো কোনো রাজ্যে। বোঝাই যায়, এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা আসলে গোঁড়া উচ্চবর্ণ হিন্দু সম্প্রদায়ের আধিপত্য বিস্তারের নির্লজ্জ চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।
এই সনাতনী ভাবধারার এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম পশ্চিমবঙ্গ, যার ট্যাগ লাইন হল, ‘মাছে ভাতে বাঙালি।’ এমনিতে আরএসএস-বিজেপি যে বাংলা ও বাঙালি বিরোধী তার অজস্র উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে মোদি জমানায়। গত দু’তিন বছরে বিজেপি শাসিত ডবল ইঞ্জিনের রাজ্যগুলিতে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্তা করা, হত্যা করার ঘটনাও ঘটেছে। বাংলায় কথা বললেই বাংলাদেশি বলে নির্মম পুলিশি অত্যাচার নেমে এসেছে বারবার। একদিকে বাঙালিদের উপর অত্যাচার, অন্যদিকে বাঙালির প্রিয় আমিষ খাদ্যের উপর কোথাও কোথাও নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়াটা যে ভোটের বাক্সে ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে পারে, তা বুঝতে পেরে ক্ষতে প্রলেপ দিতে শুরু করেছে মোদিবাহিনী। বাঙালির হৃদয় জিততে তাই উলটো পথে হাঁটা শুরু হয়েছে। লক্ষ্য যেহেতু বাংলার কুর্সি দখল করা, তাই গত বছরের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দেখা গিয়েছে দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কে বাঙালিদের দুর্গাপুজোর মণ্ডপে হাজির হতে। নেতার দেখানো পথে এখন ভোট প্রচারের ময়দানে বিজেপি প্রার্থীদের মধ্যে কার কতটা মাছ-মাংস পছন্দ তা প্রমাণ দেওয়ার সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা চলছে। এতেও চিঁড়ে ভিজবে না বুঝে মোদিজি এবার মাছপ্রেমীদের জন্য তাঁর দরদ প্রমাণ করতে মমতার সরকারকে আক্রমণ করার পথে হেঁটেছেন! বৃহস্পতিবার রাজ্যে ভোট প্রচারে এসে তাঁর অভিযোগ ছিল, নিজেদের দোষে মাছ উৎপাদনে স্বনির্ভর নয় বাংলা। অন্য রাজ্য থেকে এখানে মাছ আমদানি করতে হয়। সমস্যা হল, রাজ্যকে আক্রমণ করার আগে প্রধানমন্ত্রী কিছুটা হোমওয়ার্ক করে আসলে সত্যটা বুঝতে পারতেন। প্রকৃত সত্য হল, মাছ উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গ এখন দ্বিতীয় স্থানে। অন্তত ৮০-৯০ শতাংশ স্বনির্ভর। অন্যান্য রাজ্য থেকে আমদানির পরিমাণ তলানিতে ঠেকেছে। উল্লেখযোগ্য তথ্য হল, বাংলায় এখন ইলিশ মাছেরও চাষ হচ্ছে। ফলে মাছ নিয়ে বাঙালির মন জয়ের চেষ্টা তাঁর সফল হবে বলে মনে করার কারণ নেই।
আসলে মাছের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্কটা অনেকটা জলে কুমিরের মতো, ঠিক যেমন আমিষের সঙ্গে সম্পর্ক সিংহভাগ ভারতবাসীর। ২০১৪-তে ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশের ইতিহাস-ভূগোল-বিজ্ঞান সবই ভুলিয়ে বা পালটে দেওয়ার চেষ্টা করছে মোদির দল। সাধারণ নিয়মে বলে, মানুষ কী খাবে, কী খাবে না— তা একান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয়। এর পুরোটাই নির্ভর করে সেই ব্যক্তির রুচি ও সংস্কৃতির উপর। আহারের স্বাধীনতা সংবিধান স্বীকৃত নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার। বহু বছর ধরে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৭৫ শতাংশ ভারতীয় কোনো না কোনো সময় মাছ-মাংস-ডিম খেয়েছেন। অন্তত ২৫টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ আজও সামর্থ্য হলে আমিষ খেতে ভালোবাসেন। রাজ্যভিত্তিক তথ্যও বলছে, দেশের মাত্র পাঁচটি রাজ্যের বেশিরভাগ মানুষ নিরামিষাশী। দক্ষিণ ভারত ও পূর্বাঞ্চলে আমিষাশীর সংখ্যা ৯৭ থেকে ৯৯ ভাগ। এমন পরিসংখ্যান হাতে থাকা সত্ত্বেও মোদিবাহিনী গোটা দেশে নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস তৈরি করার জন্য বুলডোজার নীতি অনুসরণ করেছে। অথচ স্রেফ ভোটে জিততে এরাজ্যের বাঙালি মন জয়ের চেষ্টা করতে ‘মাছের’ প্রসঙ্গ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে টেনে এনেছেন মোদি। এভাবেই তিনি এরাজ্যে বিভ্রান্তি ছড়াতে চাইছেন। কিন্তু বাঙালি অস্মিতা রক্ষায় বঙ্গবাসী বদ্ধপরিকর। বিজেপি যেভাবে বাঙালি অস্মিতার উপর আঘাত আনার চেষ্টা করে তাতে বাংলা মাছ উৎপাদনে স্বনির্ভর কি স্বনির্ভর নয়—সেটা অবান্তর ইস্যু। যা টেনে এনে বিজেপি নিজেদের তৈরি করা ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু তা করা যাবে না— এটাও মোদিজিও বিলক্ষণ জানেন।