অভিষেক পাল, বহরমপুর: শহরের উপরেই চলছে ‘ভূতুড়ে’ হাসপাতাল। পুরনো জাতীয় সড়কের উপরেই ভগ্নপ্রায় এক বিল্ডিংয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলছিল প্রসূতিদের সিজার। তিনতলা ভবনের ঘুপচি ঘরেও দু’-চারটি করে বেড পেতে চলে চিকিৎসা। হাসপাতালে রোগীদের ভর্তি করা চললেও ‘ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট অ্যাক্ট’ মানা হচ্ছে না বলেই অভিযোগ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বালাই নেই। একটি ঘরের মধ্যেই ফেলে রাখা হচ্ছে মেডিক্যাল ওয়েস্ট। এমনকী গ্রামগঞ্জ থেকে রোগী ভর্তি করা হলেও, এখানে কোনও রেসিডেন্ট মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) বা চিকিৎসক থাকে না। কয়েকজন আয়া পুরো হাসপাতাল দেখভাল করেন। তাঁদের কাছেও কোনও ডাক্তারের নম্বর থাকে না। ফলে কোনও রোগীর অবস্থা সঙ্কটজনক হলে চিকিৎসকের কাছে খবর পৌঁছয় না। এছাড়া আরও একাধিক অভিযোগ পেয়ে বহরমপুরের ওই বেসরকারি হাসপাতালে হানা দিল স্বাস্থ্যদপ্তর ও জেলা প্রশাসন। এদিনের অভিযানে হাজির ছিলেন জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সন্দীপ সান্যাল, বহরমপুর সদরের মহকুমা শাসক শুভঙ্কর রায় সহ অন্যান্য একাধিক দপ্তরের আধিকারিকরা। অভিযানের সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সামাল দিতে হাজির ছিল বহরমপুর থানার পুলিস। ওই হাসপাতালের বিল্ডিং প্ল্যানও খতিয়ে দেখেন পুরসভার আধিকারিকরা। অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা দেখেন দমকলের আধিকারিকরা। অভিযান শেষে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য অধিকারিক মৌখিক ভাবে এই হাসপাতালে আর কোনও রোগী ভর্তি করতে নিষেধ করে দিয়েছেন। এমনকী যে দুজন রোগী আছেন, তাঁরা ছাড়া পাওয়ার পর হাসপাতালটি সিল করে দেওয়া হবে বলেই জানিয়েছেন তিনি। মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক বলেন, আদালতের একটি নির্দেশে জেলাশাসক ওই হাসপাতালের ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছেন। তাই মহকুমা শাসক এদিন ওই বেসরকারি হাসপাতালে অভিযান চালান। সেইসঙ্গে বিভিন্ন অভিযোগ পেয়ে আমরাও অভিযানে অংশ নিয়েছি। মহকুমা শাসক শুভঙ্কর রায় বলেন, জেলাশাসকের নির্দেশ পেয়ে আমরা অভিযানে গিয়েছিলাম। স্বাস্থ্যদপ্তর, ড্রাগ কন্ট্রোল, পুরসভার বিল্ডিং প্ল্যান, ফায়ার ব্রিগেড সবাই যে যার বিষয় খতিয়ে দেখলেন। তারপর একটা রিপোর্ট দেবেন। সেই মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ম্যানেজারকে ফোন করে ডাকা হলেও উনি আসেননি। তবে প্রাথমিকভাবে যা দেখলাম, এখানে সঠিক পরিকাঠামো নেই। চরম অব্যবস্থার মধ্যেই চলছে পরিষেবা। আমরা সবটা নোট করেছি। যদিও কর্তব্যরত এক চিকিৎসক সৌমিক হালদার বলেন, সম্ভবত এই নার্সিংহোমের ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে বিল্ডিং মালিকদের কোনও সমস্যা চলছে। বেশ কিছু অভিযোগ পেয়ে জেলা প্রশাসন এবং মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক এদিন তদন্তে এসেছিলেন। আমাকেও ডাকা হয়। ওরা যা যা জিজ্ঞাসা করেছেন, আমি জানিয়েছি। চিকিৎসক তথা জেনারেল সার্জেন তাপসকুমার ঘোষ এই বেসরকারি হাসপাতালের বিল্ডিংয়ের মালিক। এদিন তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে চলছে এই নার্সিংহোম। একজনকে মাসিক প্রায় পাঁচ হাজার টাকা দরে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। এখন সেই চুক্তিপত্রে অবৈধভাবে ডেট বসিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে তারা। ২০০৩ সালে আমার সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল হাসপাতালের ম্যানেজমেন্টের। সাত বছরের জন্য প্রাথমিক চুক্তি হলেও, ২০১০ সালের পর থেকে আর কোনও চুক্তি হয়নি। এমনকী হাসপাতালের লাইসেন্স পুনর্নবীকরণ করেনি ম্যানেজমেন্ট। একাধিকবার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিককে বললেও কোনও কাজ হয়নি। লাইসেন্স ছাড়াই চলছে হাসপাতাল। তাই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলাম। আদালতের নির্দেশেই আজ আধিকারিকরা এসেছিলেন। যদিও মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক বলেন, ২০২২ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত লাইসেন্স করেছে ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।



