Bartaman Logo
১৮ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

মাটিয়ারিতে ধুঁকছে বাংলার প্রাচীন কাঁসা-পিতল শিল্প

মাটিয়ারিতে ধুঁকছে বাংলার প্রাচীন কাঁসা-পিতল শিল্প
  • ২৪ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
অগ্নিভ ভৌমিক, মাটিয়ারি: ‘ভাত দেওয়ার মুরদ নেই, কিল মারার গোঁসাই’—নদীয়ার কালীগেঞ্জের মাটিয়ারিতে এখন কান পাতলেই প্রতিধ্বনিত হতে থাকে এই প্রবাদটি। নিশানায় অবশ্য কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। 
Advertisement
প্রাচীন কাঁসা-পিতলের শিল্পকে ঘিরে খ্যাতি মাটিয়ারির। স্থানীয় অর্থনীতির বুনিয়াদও এই শিল্পকে কেন্দ্র করে। অথচ, বেশ কয়েকমাস কেন্দ্রের জিএসটি’র কোপে সেই অর্থনীতিটাই ভেঙে পড়েছে। ঘোরতর সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে কাঁসা-পিতলের শিল্প। চরম বিপাকে পড়েছেন শিল্পীরা। রুজিরুটি হারানোর আশঙ্কায় দিশেহারা সকলেই। ইতিমধ্যেই লাভ-লোকসানের ব্যালান্স করতে না পরে পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। আরও অনেকেই সেই তালিকায় রয়েছেন। তাঁদের দাবি, কাঁসা-পিতলের উপর উচ্চহারে জিএসটি বসিয়েছে কেন্দ্র। ফলে, কেজি প্রতি ৬ শতাংশ ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। তাতে সারাদিন খেটেখুটেও লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছেন না। শিল্পীদের কথায়, জিএসটিতে চূড়ান্ত বৈষম্য থাকার কারণে এমন সমস্যা দেখা দিয়েছে। এমনিতেই প্লাস্টিক নির্ভর ব্যবহারিক জীবনে কাঁসা পিতলের চাহিদা তলানিতে। তারউপর কেন্দ্র জিএসটি চাপিয়ে দিয়ে শিল্পের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়েছে।  এক লাফে উৎপাদন খরচ বেড়েছে বহুগুণ। আবার খোলা বাজারেও কাঁসা-পিতলের দাম সেভাবে বাড়েনি। 
মাটিয়ারি গ্রাম কাঁসা-পিতল শিল্পের জন্য বিখ্যাত। গ্রামের বহু মানুষ এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে কাঁসা-পিতলের সামগ্রী তৈরির কারখানা। ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগপতিও রয়েছেন এখানে। যাঁরা এখনও এই শিল্পকে ধরে রেখেছেন। এরকম ২০০ জন মহাজন শ্রেণির ব্যবসায়ী রয়েছেন। কলকাতা, বহরমপুর, কাটোয়া সহ বিভিন্ন জায়গায় এই কাঁসা-পিতলের সামগ্রী পাঠানো হয়। চাহিদা মতো ভিনরাজ্যেও রপ্তানি করা হয়।  গ্রামবাসীদের কথায়, প্লাস্টিক যুগের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে কাঁসা-পিতলের শিল্প ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। আগের তুলনায় শিল্পীর সংখ্যা অনেকটাই কম। এখন একজন শ্রমিককে দুজনের কাজ করতে হয়। আগে একজন শ্রমিক প্রতি দিন ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় কাজ করত। এখন সেই শ্রমিক দিনে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায় কাজ করছেন। শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত পারিশ্রমিকেই কাজ করাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এখনও প্রায় ১০ হাজার মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। 
এবার কেন্দ্রের জিএসটি তাঁদের ভাতও কেড়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে থেকে অব্যবহৃত ভাঙরির যাবতীয় ধাতব সামগ্রী নিয়ে আসা হয় মাটিয়ারি গ্রামে। সেগুলি গলিয়ে কাঁসা-পিতলের বিভিন্ন সামগ্রী বানানো হয়। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় কুড়ি টন ভাঙরির সামগ্রী আনা হয়।‌ কিন্তু বর্তমানে এই ভাঙরির সামগ্রীর উপর জিএসটি বসিয়েছে কেন্দ্র। প্রতি কেজিতে ১৮ শতাংশ করে জিএসটি দিতে হচ্ছে। কিন্তু সেই কাঁসা-পিতলের বিভিন্ন সামগ্রী যখন ব্যবসায়ীরা বাজারে বিক্রি করতে যাচ্ছেন তখন ১২ শতাংশ জিএসটি পাচ্ছেন। এই ৬ শতাংশের তারতম্যে  ব্যবসায়ীদের লভ্যাংশ অনেকটাই কমে গিয়েছে। বহুক্ষেত্রে লাভও মিলছে না বলে অভিযোগ। 
মাটিয়ারির ব্যবসায়ী রঞ্জিত ঘোষ বলেন, ‘আগে ভাঙরির ধাতব সামগ্রী ৪০০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যেত। জিএসটির জন্য এখন তা ৪৭২ টাকা কেজিতে কিনতে হচ্ছে। অথচ, কাঁসা পিতলের সামগ্রী বিক্রি করতে গেলে তার উপর ১২ শতাংশ জিএসটি লাগছে।‌ এই অস্বাভাবিক তারতম্যে আমাদের লাভ সেভাবে হচ্ছে না। সরকার যদি জিএসটির এই বৈষম্য কমিয়ে দেয়, তাহলে আমাদের সুবিধা হবে।’ অন্য ব্যবসায়ী সজল ঘোষ, অমিত বর্মণের কথায়, ‘আগে প্রতি কেজিতে আমাদের ১০ থেকে ১২ টাকা লাভ হতো। এখন জিএসটির কারণে সেই লাভ অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। ফলে, অনেকে পেশা ছেড়ে অন্যকাজে চলে যাচ্ছেন।’
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ