রঞ্জুগোপাল মুখোপাধ্যায়, বাঁকুড়া: ছাতনা ব্লকের জিড়রা গ্রামের কালী সারাবছর শিকল দিয়ে বাঁধা থাকে। কথিত আছে, বহুবছর আগে শুশুনিয়া পাহাড় সংলগ্ন ওই জনপদে মা কালীর প্রতিষ্ঠাতা সাধকের সঙ্গে দেবীর মনোমালিন্য হয়। তখন মা কালী মন্দির ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন। সাধক দেবীকে মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে এনে মন্দিরের দেওয়ালের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে দেন। এরপর থেকে এখনো দেবীকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। পুজোর সময় প্রতিমা শিকলাবদ্ধই থাকে। বিসর্জনের পর জলাশয় থেকে তুলে আনা প্রতিমার কাঠামোও সারাবছর একইভাবে থাকে বাঁধা।
আগে জিড়রা গ্রামে কোনো বসতি ছিল না। কয়েক’শো বছর আগে শুশুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা বন্দিরাম বন্দ্যোপাধ্যায় স্বপ্নাদেশ পেয়ে জিড়রার জঙ্গলের মধ্যে কালীপুজো শুরু করেন। বন্দিরামের উত্তরসূরিরা বর্তমানে পুজো চালিয়ে যাচ্ছেন। সেবাইতদের মধ্যে সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বন্দিরামের পর বংশানুক্রমে পুজো চলে আসছে। আমি বংশের ষোলোতম পুরুষ হিসাবে কালীপুজো করছি। আমার ঠাকুরদা পাঁচ কিলোমিটার দূরের শুশুনিয়া থেকে জিড়রায় এসে বসতি স্থাপন করেন। বন্দিরাম লতাপাতার ছাউনির নীচে কালীপুজো করতেন। পরে ছাতনার রাজারা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। রাজ পরিবারের তরফে পুজো চালানোর জন্য দেবত্তর সম্পত্তিরও ব্যবস্থা হয়। জিড়রার মা কালীর কৃপায় জন্য ছাতনার রাজারা একবার যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। পরবর্তীকালে আমরা কালী মন্দিরের সংস্কার করেছি। সন্দীপবাবু আরো বলেন, বন্দিরামের সঙ্গে মনোমালিন্যের পর বালিকারূপী মা মন্দির লাগোয়া কালীবাঁধের দিকে চলে যাচ্ছিলেন। পুকুর পাড় থেকে দেবীকে বন্দিরাম ফিরিয়ে এনে শিকলের সাহায্যে বেঁধে দেন। ওই জলাশয়েই বর্তমানে দেবী প্রতিমার বিসর্জন হয়। আমরাও সারাবছর মাকে শিকলে বেঁধে রাখি। পুজোর সময় ধূম করে দেবীর আরাধনা হয়। এছাড়াও সারাবছর হয় নিত্যপুজো। রীতি অনুযায়ী, দেবীর চক্ষুদানের সময় পাঁঠা বলি হয়। সেই মহাপ্রসাদ রান্না করে দেবীর ভোগের সঙ্গে দেওয়া হয়। যজ্ঞ না হওয়া পর্যন্ত ভক্তরা উপবাসেই থাকেন।
প্রতিমা শিল্পীরাও বংশানুক্রমে এই দেবীর মূর্তি গড়েন। তাঁরা বড়জোড়ার আশুরিয়ার বাসিন্দা। কথিত আছে, একবার শিল্পী জিড়রার কালী প্রতিমা তৈরি করতে অস্বীকার করেছিলেন। তিনি অন্যত্র প্রতিমা গড়তে চলে যান। ফলে পুজো নিয়ে অনিশ্চিয়তা তৈরি হয়। রাতে দেবী রুদ্রমূর্তি ধারণ করে ওই শিল্পীকে স্বপ্নাদেশ দেন। পরদিন শিল্পী কাঁপতে কাঁপতে মন্দির প্রাঙ্গনে হাজির হয়েছিলেন। ওইদিন থেকেই তিনি প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু করেছিলেন। তার আগে দেবীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন।



