


বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: মায়েদের চোখের জল মুছিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অন্তত এক দশক ধরে বিজেপির প্রচার তেমনই। নেপথ্যে, উজ্জ্বলা যোজনা। কয়লা ও কাঠের উনুনে রান্নার সময় মায়েদের চোখের জল মুছেছে ‘সস্তায়’ রান্নার গ্যাসের এই সরকারি ব্যবস্থা। আর এতে গ্রাহক সংখ্যা বেড়েছে বলেই দাবি পেট্রলিয়াম মন্ত্রকের। বাস্তব কি তাই? সত্যিই কি প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ এখন এলপিজি ব্যবহারেই সরে এসেছেন? এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা এডিবি তার সাম্প্রতিক রিপোর্টে দাবি করেছে, দাবির সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। কারণ, নিম্ন আয়ের বহু গ্রাহক এখনও উজ্জ্বলার ছাতার বাইরে থেকে গিয়েছেন। যাঁদের নাম খাতায়-কলমে নথিভুক্ত রয়েছে, তাঁদেরও একটা বড়ো অংশ জ্বালানি হিসাবে বেছে নিচ্ছেন কাঠকেই। বাধ্য হয়ে। তাঁদের বেশিরভাগেরই বছরে ১২টা ‘উজ্জ্বলা গ্যাস’ কেনার সামর্থ্য নেই। নাম তাঁদের নথিভুক্ত থাকছে, বছরে একটা কী দুটো সিলিন্ডার বুকও করছেন। কিন্তু রান্নার সময় জ্বালানি বলতে সেই কাঠ। সরকার যতই ভরতুকির বহর বাড়াক, উজ্জ্বলা সিলিন্ডার তাঁদের কাছে যথেষ্ট ‘দামি’।
ভারতে উজ্জ্বলা যোজনার গ্রহণযোগ্যতা কতটা, তা পরখ করতে আটটি রাজ্যের প্রায় সাড়ে আট হাজার পরিবারকে বেছে নিয়েছিল এডিবি। তাঁদের ৮৩ শতাংশ গ্রামের বাসিন্দা, বাকিরা শহরের। সমীক্ষার তালিকায় অবশ্য পশ্চিমবঙ্গ নেই। এই প্রকল্পে নাম তোলার ক্ষেত্রেও যে হারে বাংলাকে ‘বঞ্চনা’র মুখে পড়তে হয়েছিল, তাতে এ রাজ্যের নাম না থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। সমীক্ষা শেষে দেখা গিয়েছে, এই ৮ হাজারের মধ্যে অর্ধেকেরই উজ্জ্বলা কানেকশন নেই। যাঁদের আছে, তাঁদের মধ্যেও মাত্র ৮৭৬ জন গ্রাহক প্রাথমিক জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করেন রান্নার গ্যাস। ৩ হাজার ৩৬৪ জন গ্রাহক সিলিন্ডার কিনলেও, কাঠ জ্বালিয়েই রান্না করতে বাধ্য থাকেন। অন্যদিকে ওই ৮ হাজারের মধ্যে যাঁরা উজ্জ্বলার গ্রাহক নন, তাঁদের মাত্র ৭৫৭ জন রান্নার গ্যাস ব্যবহার করেন। খরচের জন্য ৩ হাজার ৪৭৬ জন সিলিন্ডার বুকিংয়ের কথা ভাবতেই পারেন না। এর থেকেই স্পষ্ট, উজ্জ্বলার গ্রাহক হওয়াটা বড়ো কথা নয়, ৮১ শতাংশ দেশবাসী এখনও রান্নার গ্যাসকে প্রথম পছন্দ করেই উঠতে পারেননি।
কেন এই শোচনীয় পরিস্থিতি? রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, করোনার আগে পরিস্থিতি এতটা খারাপ ছিল না। করোনা পরবর্তী সময়ে মানুষ ফিরে গিয়েছেন কাঠ বা কয়লার যুগে। দেখা যাচ্ছে, যাঁরা সিলিন্ডার ব্যবহার বাড়িয়েছেন (বছরে অন্তত ৬টা), তাঁদের অন্তত ৩৬ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিক পাশ বা তার বেশি। যাঁরা কম সিলিন্ডার কেনেন, তাঁদের ২৭ শতাংশ মাধ্যমিক পাশ করেছেন। এই দুই শ্রেণির গড় মাসিক আয়ের তফাৎ প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টাকা। সমীক্ষায় প্রায় সব মহিলা জানিয়েছেন, উজ্জ্বলা যোজনায় সংযোগ পেতে প্রশাসনিক ঝামেলা অনেক বেশি। অন্তত ২৫ দিন সময় লেগে যায়।
সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ৫৬ শতাংশ ক্ষেত্রে বাড়িতে সিলিন্ডার ডেলিভারি পান গ্রাহক। ৪৪ শতাংশ ক্ষেত্রে গোডাউন বা কমন ডেলিভারি পয়েন্ট থেকে সিলিন্ডার বয়ে আনতে হয়। তার খরচ আবার আলাদা। পাশাপাশি ওই সিলিন্ডার আনতে যে সময় ব্যয় হয়, তার ‘মূল্য’ ঘণ্টায় গড়ে ৬০ টাকা। অর্থাৎ গ্যাস আনার বদলে কায়িক পরিশ্রম করলে ঘণ্টায় ৬০ টাকা রোজগার করতে পারতেন তাঁরা। প্রশ্ন হল, রান্না গ্যাসে হবে না কাঠ জ্বেলে, সেই সিদ্ধান্ত নেবে কে? উজ্জ্বলা স্কিমটি মহিলাকেন্দ্রিক প্রকল্প হলেও, সমীক্ষা বলছে, এক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি পুরুষ। বাড়ির কোন খরচ কোন খাতে হবে, উজ্জ্বলার সুবিধাভোগী পরিবারে সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন মাত্র ৭ শতাংশ মহিলা। সাধারণ সিলিন্ডার ব্যবহারকারী পরিবারের ক্ষেত্রে সেই হার ৮ শতাংশ। অর্থাৎ পুরুষরাই ঠিক করে দেন জ্বালানির ধরন। রিপোর্ট বলছে, উজ্জ্বলা স্কিমে সিলিন্ডারের দামের প্রায় ৩০ শতাংশ ভরতুকি হিসাবে দেয় সরকার। তারপরও সেই দাম চড়া বলে মনে করে সিংহভাগ পরিবার। মূল্যবৃদ্ধি ঝাঁঝের থেকে দেশের ৮১ শতাংশ মহিলার কাছে কয়লা বা কাঠের ধোঁয়া অনেক বেশি স্বস্তির। মোদির উজ্জ্বলা ফানুস ফুটো তো হবেই।