


পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: নিজেদের হারানো জমি ফিরে পেতে ফের সেই ‘অনুপ্রবেশে’র বস্তাপচা গল্পই শোনালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৃহস্পতিবার সিউড়ির চাঁদমারি ময়দানে দলীয় প্রার্থীদের সমর্থনে জনসভা করতে এসে বাংলার জনবিন্যাস বদলে যাওয়ার পুরনো ভাঙা রেকর্ড বাজালেন তিনি। কিন্তু মোদি সুকৌশলে এড়িয়ে গেলেন সুপ্রিম কোর্টের সেই সাম্প্রতিক ‘ধাক্কা’। যেখানে অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে দিল্লি পুলিশের ‘পুশব্যাক’ করা বীরভূমের বাসিন্দা সোনালি বিবিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে তাঁরই সরকার। রাজনৈতিক মহলের মতে, সোনালি বিবির সেই বিড়ম্বনাই প্রমাণ করে দিয়েছে, মোদি-শাহদের এই অনুপ্রবেশের তত্ত্ব আসলে এক বিধ্বংসী বিদ্বেষ উস্কে দেওয়ার সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চাল মাত্র।
এদিন সিউড়ির মঞ্চ থেকে মোদি রীতিমতো হুঙ্কার দিয়ে বলেন, ‘তৃণমূল ভুয়ো নথি তৈরি করে অনুপ্রবেশকারীদের ঢোকাচ্ছে। বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হবে। অনুপ্রবেশকারীদের যারা সাহয্য করছে যে যতই শক্তিশালী হোক, তাদের চিহ্নিত করে জেলে ভরব। এটা মোদির গ্যারান্টি।’ প্রধানমন্ত্রীর দাবি, অনুপ্রবেশকারীরা নাকি এখানকার মানুষের দিনমজুরির কাজ ছিনিয়ে নিচ্ছে। যার ফলে স্থানীয়দের ভিনরাজ্যে কাজ খুঁজতে যেতে হচ্ছে। যদিও এই যুক্তির পাল্টা মিনাখাঁর সভা থেকে গর্জে উঠেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সপাট প্রশ্ন, ‘বর্ডার আটকানোর দায়িত্ব কার? সীমান্তে পাহারায় কারা আছে? অনুপ্রবেশ হলে তার দায় তো পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের।’ তৃণমূলের দাবি, বিজেপি দলটাই তো আসলে ‘অনুপ্রবেশকারী’, যাদের বাংলার মাটি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে কোনও সঠিক ধারণাই নেই।
রাজনৈতিক মহলের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর এই ‘ঘুসপেটিয়া’ তত্ত্বের অসারতা প্রমাণে বীরভূমের পাইকরের বাসিন্দা সোনালি বিবির ঘটনাই যথেষ্ট। স্রেফ বাংলা ভাষায় কথা বলার ‘অপরাধে’ গর্ভবতী সোনালি, তাঁর স্বামী, নাবালক সন্তান সহ ছ’জনকে গতবছর দিল্লি পুলিশ বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করে। জোর করে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করা হয় সোনালিদের। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আদালতের নির্দেশে প্রমাণিত হয় যে সোনালিরা অনুপ্রবেশকারী নন, বরং এদেশেরই বৈধ নাগরিক। গত জানুয়ারি মাসেই সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশে সোনালিকে এদেশে ফেরানো হয়েছে। রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজে সোনালি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। মোদির সিউড়ি সফরের দিনেও এই ঘটনা জেলার মানুষের মনে টাটকা। তৃণমূলের অভিযোগ, এত কিছু সত্ত্বেও ফের একই বিদ্বেষের তাস খেললেন প্রধানমন্ত্রী।
রাজনৈতিক মহলের মতে, বাঙালি ঘুসপেটিয়ার জুজু খাড়া করে দেশময় এক বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে বিজেপি। এরাজ্যে অনুপ্রবেশ অবশ্যই ঘটেছে, কিন্তু সেই সংখ্যাটা কত? তার কোনও যথাযোগ্য সমীক্ষা কেন্দ্র করেনি। ফলে ভীতি আর গুজবের রাস্তা খোলা রাখা হয়েছে রাজনৈতিক ফায়দার জন্য। কে পুবের আর কে পশ্চিমের সেই বিচার না করেই স্রেফ বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে আক্রান্ত হতে হচ্ছে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের। যখন বাংলা বলার ‘অপরাধে’ ভিনরাজ্যে মানুষকে কুপিয়ে খুন করা হচ্ছে, তখন বাংলার বিজেপি নেতারা রহস্যজনকভাবে চুপ থাকেন। বাঙালি অস্মিতা আর পরিচয়ের উপর বিজেপির এই লাগাতার আক্রমণ এবার ব্যালট বক্সে কোনও প্রভাব ফেলে কি না সেটাই এখন দেখার।