Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬

মনমোহন সিং (১৯৩২-২০২৪)

মনমোহন সিং (১৯৩২-২০২৪)
  • ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
কংগ্রেস সংসদীয় দলের নেতা মনোনীত হয়েছেন নরসিমা রাও। অর্থাৎ তিনিই প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯১ সালের ২০ জুন সকালে এই পর্ব মিটে যাওয়ার পর ক্যাবিনেট সচিব নরেশ চন্দ্র নরসিমা রাওয়ের সঙ্গে দেখা করতে এলেন বিকেলে। তাঁর হাতে আট পৃষ্ঠার একটি নোট। সেটি হস্তান্তর করলেন রাওকে। মনোযোগ দিয়ে পড়লেন রাও। একবার... দু’বার। তাঁর স্বভাবত গম্ভীর মুখ আরও থমথমে হয়ে যাচ্ছে।
Advertisement
সদ্য প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আনন্দ, সেই উজ্জ্বলতার রেশ নেই। নরেশ চন্দ্রকে প্রশ্ন করলেন রাও, সত্যিই কি ইকনমির অবস্থা এতটা খারাপ? নরেশ চন্দ্র বললেন, ‘না স্যার, আসলে এর থেকেও খারাপ!’ 
প্রণব মুখোপাধ্যায়কে নরসিমা রাও বলেছিলেন তালিকা তৈরি করতে। মন্ত্রিসভার। প্রণববাবু সেই তালিকা তৈরি করলেও অর্থমন্ত্রীর নাম সুপারিশ করেননি। কারণ অর্থমন্ত্রী তো তিনিই হবেন ধরে নেওয়া যায়। কারণ কয়েকমাস আগেই ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত নোট তৈরি করে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে পেশ করেন প্রণববাবু। তখনও কেউ জানে না যে, সামনেই ভোট আসছে। রাজীব গান্ধীর বাড়িতে চরবৃত্তি করা হচ্ছে এই অভিযোগ নিয়ে প্রবল রাজনৈতিক আলোড়ন হওয়ায় চন্দ্রশেখর প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করলেন। মাত্র এক মাস আগেই তাঁর সরকারের অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিনহা পেশ করেছিলেন বাজেট। চন্দ্রশেখরের ইস্তফার পর ঘোষণা করা হয়েছিল মে মাসে হবে নির্বাচন। তবে ভারতের উপর বড়সড় ধাক্কা নেমে এসেছিল ২০ মে রাতে। শ্রীপেরুমবুদুরে। সন্ত্রাসবাদীদের নাশকতায় নিহত রাজীব গান্ধী। অতঃপর নির্বাচনে একক বৃহত্তম দল কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও।
জয়রাম রমেশকে ডেকে নরসিমা রাও একটি নাম বললেন। তাঁকে তিনি অর্থমন্ত্রী করার কথা ভাবছেন। কিন্তু তিনি কি রাজি হবেন? তাঁকে জিজ্ঞাসা করা দরকার। তিনি ডক্টর মনমোহন সিং। প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখরের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হয়েছেন আগেই। আর এই সময়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান। তবে তিনি বিদেশে। রাতে ফিরবেন। জয়রাম রমেশ ২১ জুন ভোরে ফোন করলেন। মনমোহন সিং ফিরেছেন। কিন্তু ঘুমাচ্ছেন জেট ল্যাগের কারণে। কিন্তু এখনই দরকার কথা বলা! মনমোহন সিং ঘুম চোখেই ফোন ধরলেন। প্রস্তাবটি তাঁর কি বিশ্বাস হল না? বাড়ি পৌঁছে গেলেন প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি (ওএসডি) জয়রাম। ধাতস্থ হয়ে মনমোহন সিং প্রস্তাব শুনলেন। রাজি হলেন। ‘কিন্তু স্যার জানেন?’ মনমোহন জানতে চাইলেন। স্যার কে? প্রণব মুখোপাধ্যায়। জয়রাম বললেন, ‘হ্যাঁ জানেন। প্রণবদাকে ডেপুটি চেয়ারম্যান করা হচ্ছে যোজনা কমিশনের।’ 
ঠিক এক মাস পর ১৯৯১ সালের কংগ্রেস সরকারের অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং ২৪ জুলাই লোকসভায় একটি বাজেট পেশ করলেন। শুধু ভারত নয়! গোটা বিশ্ব চমকে উঠল। ভারতের অর্থনীতির বন্ধ দরজা সেদিন থেকে খুলে গেল! শুরু হল উদার অর্থনীতির পর্ব। পণ্য থেকে পরিষেবা। বেসরকারি এবং দেশি-বিদেশি সংস্থা স্বাগত। এক বাজেটে সার, পেট্রল, রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ল। আইএমএফ থেকে লোন নেওয়ার ঘোষণা। বাজেট প্রস্তাব পেশ করে মনমোহন সিং সমাপ্তিতে বললেন, ‘ভিক্টর হুগো বলেছিলেন, যে ভাবনা রূপায়ণের সময় এসে গিয়েছে, তাকে কোনও শক্তি থামাতে পারে না। ভারতের জগৎসভায় এক শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশের সময় এসে গিয়েছে। এটাই হল সেই ভাবনা। উই শ্যাল ওভারকাম। আমরা বিশ্বকে স্পষ্ট করে জানাচ্ছি, ভারত জাগ্রত হয়েছে।’
অর্থনীতির এমন কোনও প্রশাসনিক পদ নেই যেখানে বসেননি  মনমোহন সিং। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর, অর্থমন্ত্রকের সচিব, অর্থমন্ত্রী। তাঁকে নিয়ে যে বই লেখা হয়েছিল তাঁর নাম দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার। ২০০৪ সালে মহাশক্তিশালী অটলবিহারী বাজপেয়ির সরকারকে পরাস্ত করে ইউপিএ সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রধান প্রশ্ন ছিল, কে হবেন প্রধানমন্ত্রী? সোনিয়া গান্ধী? বহু জল্পনার পর সোনিয়া জানালেন, ‘আমার অন্তরাত্মা বলছে প্রধানমন্ত্রী না হতে।’ তাহলে কে? ডক্টর সিং! মনমোহন সিংয়ের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূত্রপাত। ভারতকে নতুন দিশায় প্রবেশ করিয়েছিলেন ১৯৯১ সালে। ২০০৬ সালে গ্রামীণ ভারতকে দিলেন আশ্চর্য একটি জিয়ন কাঠি। ১০০ দিনের কাজের গ্যারান্টি! আজও যা গ্রামীণ ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এবং দিলেন তথ্য জানার অধিকার আইন। 
তিনি যা যা স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, সব পূর্ণ হয়েছে। ২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর বিশ্বের পঞ্চম অর্থনীতির ভারত, ৩ লক্ষ কোটি ডলার জিডিপির ভারত থেকে স্বভাবসিদ্ধ শান্ত ভঙ্গিতে চিরবিদায় নিলেন এই ভারতের কারিগর। নতুন ভারতের রূপকার। ভারতীয় রাজনীতির মিস্টার ক্লিন! 
সম্পর্কিত সংবাদ