নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: আটলান্টিক মহাসাগরে ‘ঝাঁপ’ মেরেছে ছেলে! গত মঙ্গলবার বিকেলের দিকে এমন একটা খবর আসার পর শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছেন দক্ষিণ কলকাতার সন্তোষপুরের লেক ইস্ট সেকেন্ড রোডের পাল পরিবার। ২৭ বছর বয়সী অর্ণব পাল পেশায় মার্চেন্ট নেভির থার্ড রেডিও অফিসার। গত জুলাই মাসের গোড়ার দিকে ‘গ্রিন ইউনিভার্স’ নামের একটি জাহাজে সিঙ্গাপুর থেকে পাড়ি দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার দিকে। আচমকাই প্রায় ১ মাস বাদে কলকাতার বাড়িতে দুঃসংবাদ এসে পৌঁছয়। তারপর থেকে কী করবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না অর্ণবের বাবা শঙ্কর পাল। কখনও থানায় যাচ্ছেন, কখনও ছুটছেন স্থানীয় বিধায়কের কাছে।
সেদিনের ঘটনা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন শঙ্করবাবু। বলছিলেন, ‘সাতমাস কাজ করে বাড়ি ফিরেছিল। তখন সিঙ্গাপুর থেকে জাপানের দিকে গিয়েছিল। বাড়িতে দু’মাস ছিল। তারপর আবার ডাক এল।’ একমাত্র ছেলে অর্ণব হলদিয়া মেরিটাইম কলেজ থেকে পড়াশুনা করেছিলেন। ‘আমি তো যাদবপুর-মুকুন্দপুর রুটে অটো চালাই। খুব কষ্ট করে পড়াশুনা করিয়েছি। অনেক কষ্ট করেছি। সেকথা আর বলার নয়। অনেকে সাহায্য করেছিলেন আমাকে। ছেলেও অনেক পরিশ্রম করেছে। নানা ধরনের পরীক্ষা দিয়ে এই জায়গায় পৌঁছেছিল। দুবাইতে ট্রেনিং নিয়েও এসেছিল’, বলতে বলতে গলা ধরে আসে শঙ্করবাবুর। অর্ণব যে কোম্পানিতে চাকরি করছিলেন সেটি সিঙ্গাপুরের। ভারতে তাদের অফিস ছিল নভি মুম্বইতে। অফিস থেকে ফোন করে ঠিক কী বলা হয়েছিল ওঁর বাবাকে? শঙ্করবাবু বলছিলেন, ‘আমাকে জিজ্ঞেস করছে, ওঁর কোনও চিন্তা ছিল কি না? ঋণের বোঝা ছিল কি না? ছেলের তো এসব কিছুই ছিল না।’ পরিবারের বক্তব্য, কোম্পানির তরফে সিসি ক্যামেরার একটি ফুটেজও দেখানো হয়েছে তাঁদের। অর্ণবের বাবার বক্তব্য, স্থানীয় থানায় তাঁরা গিয়েছিলেন। কিন্তু কোনও কাজই হয়নি। সপ্তাহ খানেক আগে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও হয়েছিল অর্ণবের। ঘটনার একদিন আগে বান্ধবীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন তিনি। অর্ণবের পরিবারের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরেই অর্ণব বলছিলেন, জাহাজের ক্যাপ্টেন তাঁর উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছেন। তাঁর উপর কাজের চাপ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এমনকি তাঁকে ব্ল্যাকলিস্ট করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি। এইসব কথাবার্তা কয়েকদিন আগে অর্ণব তাঁর বান্ধবীকে ফোন করেও জানিয়েছিলেন বলে পরিবার সূত্রে খবর। অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছিলে যে, অর্ণব বলেছিলেন, আত্মহত্যা করারও সুযোগ নেই! পরিবারের বক্তব্য, সেই চাপ না নিতে পেরেই কি তিনি এই পথ বেছে নিলেন? এই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে পরিবারের অন্দরে। পরিবার সূত্রে খবর, যাদবপুরের বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গিয়ে তাঁরা এই বিষয়ে কথা বলে এসেছেন। বিধায়ক তাঁদের সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন। সন্ধ্যায় জাহাজ মন্ত্রকে গোটা ঘটনা ই-মেল করেছে জানিয়েছে পরিবার।