রূপাঞ্জনা দত্ত, লন্ডন: শরৎ যখন তার প্রাকৃতিক শোভা দিয়ে চারিদিক মাতিয়ে রেখেছে তখন এক অনন্য আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ শহর। সৌজন্যে ইন্ডিয়ান কালচারাল সোসাইটি (আইসিএস)। এবার ২৫ বছরে পা দিল এই পুজো। রজত জয়ন্তী বর্ষে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের বার্তা তুলে ধরতে প্রস্তুত উদ্যোক্তারা।
কেমব্রিজের এই পুজো শুরু হয় ২০০২ সালে। প্রথমবার পুজো হয়েছিল মিল রোডের ভারত ভবনে। তার আগে দেবীর দর্শন পেতে লন্ডন ও বিভিন্ন শহরে ছুটতেন বাসিন্দারা। তবে মনের মধ্যে ছিল কেমব্রিজে দশভূজাকে নিয়ে আসার প্রবল বাসনা। তাই ব্রিটেনে মাতৃমূর্তির সন্ধান মিলতেই সকলে হইহই করে প্রথমবার পুজো করলেন। ঠিক যেন ‘বাড়ির পুজো’। ২০১৭ সালে আইসিএস পূজিত কলকাতার প্রতিমা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিউজিয়াম অব আর্কিওলজি অ্যান্ড অ্যান্থ্রোপোলজিতে জায়গা করে নেয়। প্রতিবছর মাতৃবন্দনায় মেতে ওঠে আইসিএস। এমনকি কোভিডের সময়ও মাতৃ আরাধনায় বাধা পড়েনি। বৃষ্টির মধ্যে বাড়ি বাড়ি ভোগ পৌঁছে দেন স্বেচ্ছাসেবকরা। রজত জয়ন্তী উপলক্ষ্যে এবার সপ্তাহব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজকদের বক্তব্য, ‘ছোটো বীজ রোপণ করেছিলাম। আজ সেটা ফল-ফুলে সমৃদ্ধ বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।’
শুরুর দিনগুলিতে দু’টি ঘরে একদিন পুজো হত। আজ তা তিনদিনের মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। পুজোর মূলমন্ত্র ‘বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান।’ সঙ্গে রয়েছে ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর বার্তা। তাই বাঙালির উৎসব হলেও সব দেশের মানুষের আমন্ত্রণ থাকে এই পুজোয়। দেবীর দর্শন করতে আসা প্রত্যেক ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয় ভোগ। খিচুড়ি আর আড্ডায় মিলেমিশে এক হয়ে যায় বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি।
সময়ের সঙ্গে বড়ো হয়েছে এই পুজো। তবে বদলায়নি বাঙালির রীতি। সমস্ত নিয়ম মেনে নিষ্ঠা সহকারে করা হয় পুজো। প্রথমদিকে ২০টি পরিবার পুজোর সঙ্গে যুক্ত ছিল। যাবতীয় কাজ করতেন ৪০ জন স্বেচ্ছাসেবক। আজ সেই সংখ্যা দেড়শো ছাড়িয়েছে। আয়োজকদের স্পষ্ট বার্তা, ‘আমরা দশে মিলি করি কাজ, হারি-জিতি নাহি লাজ। এভাবেই পায়ে পায়ে পাড়ি দিয়ে এলাম পচিশের প্রান্তে।’
পুজোর সময় কলকাতার মতোই খাওয়া-দাওয়া, আড্ডায় মেতে ওঠেন কেমব্রিজের বাঙালিরা। যাবতীয় আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য, পরবর্তী প্রজন্মকে নিজের শিকড়কে চিনতে শেখানো। দেবীর আরাধনার মধ্যে দিয়ে ছোটোরা বাংলা ভাষাকে চিনতে শেখে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাংলা গান-কবিতা আত্মস্থ করে নেয়। একসময় যারা বাবা-মায়ের হাত ধরে পুজো দেখতে আসত, তারাই আজ পুজোর গুরুদায়িত্ব পালন করছে।
কেমব্রিজের বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সেতু হিসাবে কাজ করে আইসিএস। পুজোর যাবতীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এক আয়োজকের কথায়, ‘এই পুজো কখনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। মিল রোড ও আশপাশের বাজার থেকে ফুল, আমপাতা আসে। সবজি বিক্রেতারা ভোগের সবজি ও ফল দেন। ধান, দূর্বা, মশলাও আসে স্থানীয় বাজার থেকেই। ভোগের অধিকাংশ সামগ্রী এখানকার দোকান থেকেই নেওয়ার চেষ্টা করি।’ একইসঙ্গে বিভিন্ন স্কুলকে নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করে আইসিএস। হয় বসে আঁকো প্রতিযোগিতা। এভাবেই কেমব্রিজ সিটি কাউন্সিলের সংস্কৃতি বিভাগের সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারে জায়গা করে নিয়েছে এই পুজো।