


সমৃদ্ধ দত্ত: পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন। কিন্তু সবথেকে সাজো সাজো রব, আলোড়ন, সংঘাত, কেন্দ্রীয় বাহিনী, নির্বাচন কমিশন, প্রবল উত্তাপ মাত্র একটি রাজ্য ঘিরে। পশ্চিমবঙ্গ। ১২ রাজ্যে এসআইআর হয়েছে। কবে কোন রাজ্যের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হল, কোন রাজ্য থেকে কতজন ভোটারের নাম বাদ পড়ে গেল, ট্রাইবুনালে আবেদন করার প্রক্রিয়া, এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ এসব শোনাই গেল না অন্য কোনো রাজ্যের ক্ষেত্রে। জানাও যায় না। সবই নিঃশব্দে স্বাভাবিকভাবে হয়ে যায়। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা হয় এবং এবারও হয়েছে পশ্চিমবঙ্গকে। কেন?
কারণ, একটাই। বিজেপি নয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পশ্চিমবঙ্গের ভোটে জয়লাভ করা ব্যক্তিগত এক মরিয়া লক্ষ্যপূরণ। আসলে প্রেস্টিজ ফাইট। নিছক আরও একটি অধরা রাজ্য দখল করা নয়। মোদির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং জনপ্রিয়তার ভাবমূর্তিকে নির্মাণ করবে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ফলাফল। তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে এই রাজ্যে হেরে গেলে। দলের উপর তাঁর অথরিটি চলে যাবে। তিনিই দলে শেষ কথা এরকম আর দলের একাংশ মেনে নেবে না। আর অন্যদিকে বিরোধীরা বেশি করে প্রচার করতে সুযোগ পাবে যে, মোদি আর সর্বশক্তিমান নয়। বিজেপিকে সেটা মেনে নিতে হবে। ২০১৪ সালে মোদি এক লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজ নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ১২ বছরের মাথায় সেই ইমেজ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি এবার মোদি বাংলায় জয়ী হন, তাহলে তিনি ২০১৪ সালের মতো সেই ম্যাজিকের ইমেজে পৌঁছে যাবেন। নিজের আসন দলের মধ্যে নিশ্চিত হবে তাঁর।
প্রশ্ন হল, ১৫০টি আসনে বিজেপি এবার জয়ী হলে তাহলেই সরকার গঠন সম্ভব। এই সম্ভাবনা অঙ্ক, রাজনীতি, রসায়ন, সমীকরণ, আবেগ, যুক্তি কোনোদিক থেকে কি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে? অর্থাৎ ঠিক কোন কোন আসন এবার বিজেপি জিতছেই?
এরকম একটি তালিকা করতে বলা হলে, অতি
বড়ো রাজনৈতিক বিশ্লেষক কি করতে পারবেন? দক্ষিণবঙ্গে বিজেপি কটা আসন পাবে? উত্তরবঙ্গে কটা পাবে? ঠিক দু’বছর আগে লোকসভা ভোটে
বিজেপি এতগুলো আসন হারালো কেন? তার
সঠিক কারণ কী ছিল? সেই অবস্থা থেকে এসআইআর বাদ দিলে, আর কোন ক্ষেত্রে বিজেপি পালটে গিয়েছে? এসআইআরে ২৭ লক্ষ মানুষ যদি বাদ যায়, তাহলে সেই তালিকায় সবাই কি তৃণমূল? নকি বিজেপির ভোটারও আছে? যদি থাকে, তাহলে
সেই ভোটার হারিয়ে বিজেপির আদৌ লাভ কতটা হবে? এই অঙ্কগুলিকে মিলিয়ে দিয়ে বিজেপিকে জিততে হবে এবার।
এখানেই শেষ নয়। বাংলায় পরাজিত হলে আগামী নির্বাচনগুলি এবং পরবর্তী লোকসভা ভোটেও মোদি অনেকটাই ব্যাকফুট হয়ে যাবেন। কারণ, যদি পশ্চিমবঙ্গে এবার বিজেপি পরাজিত হয়, তাহলে আগামী বছরের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ভোটে দ্বিগুণ বিক্রমে বিরোধীরা ঝাঁপিয়ে পড়বে। যোগী আদিত্যনাথকে পরাস্ত করতে। প্রসঙ্গত বিগত লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে যেমন বিজেপির আসন কমে গিয়েছিল, তার থেকে অনেক বেশি বিপর্যয় হয়েছিল উত্তরপ্রদেশে। সেখানে ২০১৯ সালে প্রাপ্ত আসনের থেকে এক ধাক্কায় বিজেপি অর্ধেকে নেমে আসে। সুতরাং উত্তরপ্রদেশ নিয়ে বিজেপি এমনিতেই টেনশনে। পশ্চিমবঙ্গে পরাজিত হলে সেই উত্তরপ্রদেশের পরাজয়ের সম্ভাবনা ত্বরান্বিত হবে। যা মোদির জন্য আরও ক্ষতিকর বার্তা।
এবারও বঙ্গদখল অধরা থাকলে এই নিয়ে একটানা ৬ বার মোদি লোকসভা ও বিধানসভা ভোটে পরাজিত হবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। মোদি সর্বত্র সর্বশক্তিমান। একমাত্র বাংলায় তিনি জিততে পারেন না, এরকম একটি প্রচার চিরতরে প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে তাঁর নামের সঙ্গে। যা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লেখা হবে এবং মোদির জন্য সেটা হবে চরম অস্বস্তিকর।
তাই ২০২৬ সাল একপ্রকার এসপার নয় ওসপার। মোদির কাছে এভার নয় নেভার! কারণ এবার পরাজিত হলে ২০৩১ সালে তিনি আর প্রত্যক্ষভাবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সেনাপতি হবেন বলে মনে হয় না। ততদিনে তাঁর বয়সও হয়ে যাবে ৮১। বিজেপিও হয়তো নতুন এক নেতৃত্বের অধীনে নতুন টিমের এক দলে পরিণত হবে। সুতরাং ২০২৬ সালে জয়ী হয়ে মোদি চাইছেন বিরোধীদের শেষ দুর্গটি দখল করতে। অতএব খুব স্বাভাবিকভাবেই কোনোপ্রকার ঝুঁকিই মোদি নিতে চাইছেন না। যতরকমভাবে তৃণমূলকে কোণঠাসা করা যায় এবং সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে স্বপক্ষে নিয়ে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যথাসম্ভব অসহায় করে দেওয়াই মোদির পরিকল্পনা। সেটাই হচ্ছে। বাংলা জিততেই হবে মোদিকে, এরকম এক বার্তা নিয়েই নেমেছেন তিনি ও দল।
গুরুত্বপূর্ণ হল, এই একটি রাজ্যের জয়পরাজয়ের উপর নির্ভর করছে মোদির বর্তমান সরকারের মেয়াদকালও। পশ্চিমবঙ্গে পরাজিত হলে, মোদির বিদায়বেলার সূত্রপাত হবে। কারণ, প্রমাণিত হবে, মোদি ম্যাচ উইনার নন। কঠিন প্রবল প্রভাবশালী প্রতিপক্ষ হলে মোদি সেই যুদ্ধে জিততে পারেন না। প্রতিপক্ষ রাহুল গান্ধী। তাই মোদি জয়ী হয়ে যান। প্রতিপক্ষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই মোদি ২০১৪ সালের পর থেকে একবারও জয়ী হতে পারেন না। ২০২৪ সালের ভোটের ফলাফল কিন্তু বিজেপি ভুলে যায়নি। যতই তারপর একাধিক রাজ্যে জয়ী হোক বিজেপি, লোকসভা ভোটে ৪০০ পাওয়ার কথা ছিল, অথচ মাত্র ২৪০ আসনে কেন বিজেপি থেমে গেল, সেই বিশ্লেষণ কী? যে ভোটব্যাংক বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল আগে, তার মানে তারাই আর ভোট দেয়নি। সেটা কেন হল? লোকসভা ভোট মোদির নামে হয়। সেই ভোটে মোদি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেন না। তাঁকে সরকার চালাতে হচ্ছে নীতীশকুমার ও চন্দ্রবাবু নাইডুর সমর্থনে ভর করে। এটা মোদির মতো আত্মগর্বী মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। অথচ তা সত্ত্বেও তাঁকে আপস করতে হচ্ছে। সুতরাং এবার বাংলার ভোটে মোদি যদি পরাজিত হন, তাহলে তাঁকে সামনে রেখে ২০২৯ সাল পর্যন্ত নিছক ওয়ান নেশন ওয়ান ইলেকশন, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, মহিলা সংরক্ষণ বিল—এসব দিয়ে কি ভোটে জয়ী হওয়া সম্ভব হবে? বিজেপি ও আরএসএসের মতো নিখুঁত সংগঠনের দল অবশ্যই চুলচেরা বিশ্লেষণ করবে যে, মোদি কি আর ইউজফুল? তাঁকে সামনে রাখলে আর কি লাভ হবে? তাই মোদিকে নিজেকে দলের কাছে এখনও প্রধান সম্পদ হিসেবে ধরে রাখতে হলে বাংলায় জিততে হবে।
অসমে বিজেপি আবার সরকার গড়তেই পারে। কিন্তু সেটি হবে হিমন্ত বিশ্বশর্মার একক আগ্রাসী এক রাজনীতির জিত। তামিলনাড়ুতে এআইএডিএমকে এখনও জয়ললিতার দল। কিন্তু জয়ললিতা থাকা আর না থাকার মধ্যে পার্থক্য অনেক। তাদের আশা ছিল নরেন্দ্র মোদিকে দিয়ে কিছুটা হলেও সেই তারকার অভাব পূরণ করবে। কিন্তু সেই রাজ্যে বিজেপি কোনো বড়ো শক্তি নয়। মাত্র ২৭ আসনে লড়াই করছে। তাই মোদির একক ম্যাজিকে জেতার আশা বিজেপি করছে একমাত্র বাংলায়। অতএব বাংলার ফলাফলই মোদির জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
পশ্চিমবঙ্গে এবারও বিজেপির যদি নিরাশজনক ফলাফল হয়, তাহলে বঙ্গ বিজেপির আমূল বদল হয়ে যাবে। ঠিক এই ফরম্যাটেই টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। বাংলায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে যে অপশাসনের অভিযোগ বিজেপি করে থাকে, সেই প্রতিটি সমস্যার দূরীকরণ বিজেপি ক্ষমতায় এলে মোদি করে দেবেন বলে তারা প্রচারে বলে। অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রচার। মোদির দিকে তাকিয়েই ভোট করছে বিজেপি। এককভাবে বঙ্গ বিজেপির কোনো নেতা গোটা রাজ্যের কাছে আকর্ষণীয় নয়। তাই ভোটে এবার পরাজিত হলে বঙ্গ বিজেপির মধ্যে কাঠামোয় বদল হয়ে যাবে।
তৃণমূলের দুই প্রকার ভোটার আছে। একটি অংশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখেই ভোট দেয়। দ্বিতীয় অংশ বিজেপির রাজনীতির প্রবল বিরোধী। তাই তৃণমূলকে ভোট দেয়। অন্যদিকে, বিজেপির ভোটাররা তিনটি কারণে বিজেপিকে ভোট দেয়। প্রথমত, নরেন্দ্র মোদিকে দেখে। দ্বিতীয়ত, হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডায়। এবং তৃতীয়ত, যারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধী। এই শেষাংশের সিংহভাগ সিপিএম সমর্থক ছিল। বিগত বছরগুলিতে তারা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। এবারও যদি সেটাই করে, তাহলে সিপিএমের ক্ষতি। আর নচেৎ বিজেপির ক্ষতি।
এই মডেলেই বিগত ভোটগুলিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই জয়ী হয়েছেন বারংবার। এবার যুক্ত হয়েছে এসআইআর। মোট ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম নানাবিধ কারণে তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে।
এবার ভোটে কোনো ইস্যুতে ভোট হচ্ছে না। ইস্যু
তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে বিরোধীরা। এই ইস্যুহীন ভোটে একমাত্র ইস্যু এসআইআর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে এবারও প্রধান শক্তি
‘মহিলা-মুসলিম’ ভোটব্যাংক। আর বিজেপি মনে করছে, তাদের নিজেদের ভোটব্যাংকের সঙ্গে এবার অতিরিক্ত শক্তি ‘এসআইআর’। সেটাই কি বাস্তবায়িত হবে? নাকি এসআইআর বিজেপির ক্ষতি করবে? এবার মূল ফ্যাক্টর এটাই!