নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: অবশেষে আত্মসমর্পণ করতে চলেছেন বাংলা-ঝাড়খণ্ড জঙ্গলমহলের ‘খতরনাক’ মাওবাদী দম্পতি শচীন-মিতা। মাওবাদী মুক্ত ভারত—কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের প্রত্যয়ী ঘোষণার প্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লাগাতার অভিযান চালিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী কার্যত ‘নিশ্চিহ্ন’ করে ফেলেছে নিষিদ্ধ এই সংগঠনের ক্যাডারদের। ঝাড়খণ্ড-বাংলা-ওড়িশা রিজিওনাল কমিটি তার ব্যতিক্রম নয়। নিরাপত্তা বাহিনীর নাগাড়ে অভিযানে কোণঠাসা হয়েই রিজিওনাল কমিটির সদস্য তথা স্বামী রামপ্রসাদ মাণ্ডি ওরফে শচীন ওরফে সুনীলকে সঙ্গে আত্মসমর্পণ করতে চলেছেন পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামের সোনাচূড়ার মেয়ে মিতা সাহু ওরফে নয়নতারা ওরফে ঝুম্পা ওরফে পরী। ২০০৭ সালের মার্চ মাসে ঘাটশিলায় জামশেদপুরের সাংসদ সুনীল মাহাতকে গুলি করে খুনের ঘটনার মূল অভিযুক্ত এই দম্পতিকে দীর্ঘদিন ধরে খুঁজছিল সিবিআই। দু’একদিনের মধ্যে এই মাও দম্পতি রাজ্য পুলিশের শীর্ষকর্তাদের সামনে অস্ত্রসহ আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মসমর্পণ করবেন। তাঁদের সঙ্গেই আত্মসমর্পণ করার কথা সাংসদ খুনের অপর অভিযুক্ত গৌরি ওরফে বুলু মাহাত নামে অপর এক মাওবাদীর। ইতিমধ্যেই এই দম্পতির কাছ থেকে মেলা তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবারই বাংলা লাগোয়া ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম জেলার কুচাই থানার রোলাহাতু জঙ্গলের গোপন ডেরা থেকে মাওবাদীদের একটি অস্ত্রভাণ্ডারের হদিশ পায় বাঁকুড়া জেলার পুলিশ। অভিযানে ছিল সিআরপি এবং ঝাড়খণ্ড পুলিশও। উদ্ধার করা হয়েছে একটি এসএলআর, একটি ইনসাস রাইফেল, দুটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল, ১২০ রাউন্ড গুলি, ক্যান বম্ব, দেশি পিস্তল সহ আরও বেশ কিছু গোলাবারুদ। আরও কয়েকটি লুকানো অস্ত্রভাণ্ডারের খোঁজ চলছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পুরুলিয়ার বান্দোয়ান লাগোয়া ঝাড়খণ্ডের পটমদা থানার ঝুমকা গ্রামের বাসিন্দা শচীন জঙ্গলমহলে উত্তাল সময়ে মাওবাদীদের সংস্রবে আসে। ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ি স্কোয়াড কমান্ডার রঞ্জিৎ পাল ওরফে রাহুলের হাত ধরে কিষেনজির সংস্পর্শে এসেছিলেন শচীন। ঝাড়খণ্ড ও বাংলায় বেশ কয়েকটি থানায় মোট ৪৪টি মামলায় অভিযুক্ত শচীনের মাথার দাম ১৫ লক্ষ টাকা ঘোষণা করেছিল পুলিশ। ২০১০ সালে সোনাচূড়ার বাসিন্দা মিতার সঙ্গে ‘কমরেড ম্যারেজ’ হয় তাঁর। ২০০৭’এ নন্দীগ্রাম আন্দোলন পর্বে মাতঙ্গিনী মহিলা সমিতির সঙ্গে যুক্ত থাকা মিতা পরে মাওবাদী স্কোয়াডে যোগ দিয়ে কমান্ডারও হন। ১৯টি মামলায় অভিযুক্ত মিতা পূর্ব সিংভূম এরিয়া কমিটির সদস্য। স্বামী শচীনের সঙ্গে মিতা অপর এক মাওবাদী সঙ্গী গৌরি ওরফে বুলু মাহাত’র সঙ্গে সারান্ডার পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা দুর্গম এলাকায় আত্মগোপন করেছিলেন। কিন্তু সেখানে যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে ক্রমশ কোণঠাসা হয়েই আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনজনই। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মাওবাদী নেত্রী মিতার মাথার দাম ছিল ১০ লক্ষ টাকা এবং গৌরিকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্যও ১০ লক্ষ টাকা ‘রিওয়ার্ড’ ঘোষণা করা হয়েছিল।
পুলিশের ওই সূত্রটি জানিয়েছে, ঝাড়খণ্ডের এমপি খুন ছাড়াও এ রাজ্যের জঙ্গলমহলে সাঁকরাইলে থানা আক্রমণ এবং ওসি অপহরণ, শিলদা ইএফআর ক্যাম্পে ইএফআর জওয়ানদের উপর প্রাণঘাতী হামলা এমনকি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কনভয়ে মাইন হামলার সঙ্গেও যুক্ত ছিল এই দম্পতি। গোয়েন্দারা বলছেন, এই দম্পতি এবং গৌরি আত্মসমর্পণ করতে চলায় মাওবাদীদের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশের স্কোয়াড কার্যত অচল হয়ে পড়ল। ১ কোটি টাকা মাথার দামের আকাশ এখন দুই সহযোগী মঙ্গল সিং সর্দার ও তাঁর স্ত্রী মালতী মুর্মুকে সঙ্গে নিয়ে পূর্ব সিংভূম জেলার দলমা রেঞ্জের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।