সবুজ বিশ্বাস, জঙ্গিপুর: ভোট মিটতেই জঙ্গিপুরে এখন আইপিএল নিয়ে উন্মাদনা তুঙ্গে। তবে এই ক্রিকেট উন্মাদনার আড়ালে রয়েছে ভয়ঙ্কর এক নেশা। তা হল অনলাইন বেটিং। বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ আর অনলাইন সাইটের মাধ্যমে বেটিং করে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার নেশায় বুঁদ এলাকার যুবসমাজ। বেটিংয়ের ফাঁদে পড়ে প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত হচ্ছে একের পর এক পরিবার। প্রশাসনের অলক্ষ্যেই প্রত্যন্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে এই জুয়ার জাল।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কাটাচেরা দু’-তিন দিনেই স্তিমিত হয়ে গিয়েছে। এখন পাড়ার মোড়, চায়ের দোকান কিংবা গঙ্গার ঘাট সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আইপিএল। কোন দল শক্তিশালী, কার ব্যাটিং অর্ডার কেমন, কোন খেলোয়াড় কত টাকার চুক্তিতে বিক্রিত, যুবকদের মুখে মুখে ঘুরছে সেসব পরিসংখ্যান। হাতে দামি স্মার্টফোন নিয়ে রেকর্ড বইয়ের মতো তথ্য উগরে দিচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু এই ক্রিকেটীয় তর্কের আড়ালেই নিঃশব্দে চলছে টাকার লেনদেন। জানা গিয়েছে, এই বেটিং চক্রের মূল চালিকাশক্তি হল বুকি বা মিডলম্যানরা। পুলিশি নজরদারি এড়াতে তারা ব্যবহার করছে এক অদ্ভুত ‘কোড ল্যাঙ্গুয়েজ’ বা সাঙ্কেতিক ভাষা। কোড ব্যবহার করে চলছে বাজি ধরা। ‘হট ফেভারিট’ দলের জেতা-হারার ওপর ভিত্তি করে প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে রেট। কখনও কখনও মাত্র ১ হাজার টাকার বাজিতে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জেতার টোপ দেওয়া হচ্ছে।
চুক্তি পাকা করছে। প্রমাণ হিসেবে রাখছে ভয়েস রেকর্ড, যাতে পরে কেউ টাকা দিতে অস্বীকার করতে না পারে। আর খেলা শেষ হতেই পরদিন সকালে কোনো গোপন ডেরা বা চায়ের দোকানে চলে ক্যাশ লেনদেন। এই মরণখেলায় সবচেয়ে বেশি মেতেছে স্কুল-কলেজের পড়ুয়া এবং বেকার যুবকরা। ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার এই চোরাবালিতে পা দিয়ে অনেকেই খোয়াচ্ছেন বাবার পেনশনের টাকা, কেউ আবার চড়া সুদে ঋণ নিচ্ছেন মহাজনদের কাছ থেকে। শান্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে বাড়ছে অশান্তি। স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ, এইভাবে চলতে থাকলে এলাকার যুবসমাজের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে যাবে। জঙ্গিপুরে বাসিন্দা আনন্দমোহন দাস বলেন, অনলাইন গেম আর আইপিএল জুয়া আমাদের ছেলেদের শেষ করে দিল। সারাদিন ফোনে কী যে করে বোঝা যায় না, তারপর হঠাৎ একদিন শোনা যায় হাজার হাজার টাকা দেনা করে বসে আছে।
এই রমরমিয়ে চলা বেটিং চক্র নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে। যদিও পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তারা দাবি করছেন, এই বিষয়ে তাঁরা যথেষ্ট সতর্ক। জঙ্গিপুরের এক পদস্থ পুলিশ আধিকারিক জানান, আইপিএল বেটিং রুখতে পুলিশের কড়া নজরদারি রয়েছে। ইতিমধ্যেই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও বেশ কয়েকজন যুবককে আটক করা হয়েছিল এবং পরে সতর্ক করে ছাড়া হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ এখনও মেলেনি। অভিযোগ পেলেই আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত পুলিশের এই আশ্বাসের ওপর ভর করেই সুদিনের অপেক্ষায় রয়েছেন জঙ্গিপুরের মানুষ।