


নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: জমানা বদলেছে। রাজ্যে রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তনের সঙ্গেই রাজ্যজুড়ে বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে তৎপরতা শুরু হয়েছে। প্রশাসনিক কড়াকড়ির জেরে শান্তিনিকেতনে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। গত কয়েক বছরে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যেসব বিলাসবহুল বেআইনি রিসর্ট ও হোটেল গড়ে উঠেছিল সেগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যারা এতদিন ক্ষমতার দাপটে অবৈধ ছাড়পত্র বিলি করেছিল তাদের কপালেই বা কী নাচছে? শান্তিনিকেতন ও বোলপুরের জমি মাফিয়া ও বেআইনি কারবারিদের কার্যত ঘুম উবে গিয়েছে। চাপে রয়েছেন তৃণমূল নেতাদের একাংশ।
কবিগুরুর ‘প্রাণের আরাম’ শান্তিনিকেতন আজ মূলত কালো টাকা আর রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের স্বর্গরাজ্য। সোনাঝুরির শালবন থেকে কোপাইয়ের তীর-সর্বত্রই শুধু কংক্রিটের আস্ফালন। যে শান্তিনিকেতন চেনা যেত লাল মাটি আর বাউলের সুরে, সেখানে আজ বেআইনি নির্মাণ ও মধুচক্রের রমরমায় কলুষিত হচ্ছে। অভিযোগ, এই গোটা সাম্রাজ্যের পিছনের ‘সুতো’ বাঁধা ছিল সেই দাপুটে ‘কেষ্টবিস্টু’দের আঙুলে। গত এক দশক ধরে বীরভূমে প্রশাসন মানেই ছিলেন একজন। দলও চালাতেন তিনি। প্রশাসনও চলত তাঁর ইশারায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সেই ‘বাঘের’ আশীর্বাদ ধন্য হয়েই শান্তিনিকেতন, তালতোড়, প্রান্তিক থেকে কোপাইয়ের তীরে অবৈধ উপায়ে গজিয়ে উঠেছে একের পর এক বিলাসবহুল আবাসন ও হোটেল। সোনাঝুরির সংরক্ষিত বনাঞ্চলেও তৈরি হয়েছে একাধিক রিসর্ট ও ঝাঁ চকচকে ব্যক্তিগত বাংলো। কবিগুরুর সাধের শান্তিনিকেতন পরিণত হয়েছে জমি মাফিয়াদের স্বর্গরাজ্যে।
ক্ষমতার জোরেই শ্রী হারিয়েছে কোপাই নদী। নদীর চর দখল করে তৈরি হওয়া রিসর্টে গত বর্ষায় জল ঢুকে পর্যটকরা বিপদে পড়লেও হুঁশ ফেরেনি প্রশাসনের। একইভাবে গোয়ালপাড়ায় স্কুলের জমি, কিংবা কসবা গ্রাম পঞ্চায়েতে আদিবাসীদের পাট্টার জমি কেড়ে নিয়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে উঠেছে বিলাসবহুল আবাসন। এনিয়ে স্থানীয় স্তরে কম লড়াই-আন্দোলন হয়নি। কিন্তু জমি মালিকদের মাথায় তৎকালীন শাসকদলের শীর্ষ নেতাদের আশীর্বাদের হাত থাকায় এতদিন কোনো কাজ হয়নি।
অভিযোগের পাহাড় জমলেও বছরের পর বছর প্রশাসন ছিল কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ। ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, বীরভূমের সেই ‘বাঘের’ দাপটেই নীরব থাকতেন আমলারা। যখনই বেশি তোলপাড় হয়েছে, প্রশাসনের কর্তারা ফিতে নিয়ে জমি মাপতে ছুটেছেন। কিন্তু ওখানেই শেষ। এখনও পর্যন্ত কোনো অবৈধ রিসর্ট ভেঙে জায়গা দখলমুক্ত করার সাহস দেখায়নি প্রশাসন।
এসবের পাশাপাশি শান্তিনিকেতন ও পার্শ্ববর্তী একাধিক রিসর্ট ও হোটেলে রমরমিয়ে মধুচক্র চলছে। শান্তিনিকেতন থানার পুলিশ একাধিকবার বিভিন্ন হোটেলে অভিযান চালিয়ে মধুচক্রের পর্দা ফাঁস করেছে। কিন্তু স্রেফ চুনোপুঁটিরা গ্রেপ্তার হয়েছে। এই চক্রের পিছনে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে বোলপুরের এক প্রভাবশালীর নাম। যিনি পুরসভার এক মহিলা জনপ্রতিনিধির আত্মীয় এবং জেলার এক হেভিওয়েট বিধায়কের ছত্রছায়ায় পুষ্ট। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপই করেনি পুলিশ।
রাজ্যে পালাবদলের পর পরিস্থিতি বদলেছে। সিউড়ির বিধায়ক তথা বিজেপির রাজ্য সহ সভাপতি জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন, বীরভূমে কোনটা বৈধ ছিল এতদিন? সবে সরকারে এসেছি। সবকিছুর হিসাব হবে। প্রশাসনের এক পদস্থ কর্তা বলেন, প্রচুর অবৈধ নির্মাণ হয়েছে। সরকারি নির্দেশ এলেই এবার বড়সড় পদক্ষেপ করা হবে। তৃণমূলের জেলা সহ সভাপতি মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন, অবৈধ নির্মাণ হয়ে থাকলে প্রশাসন খতিয়ে দেখুক।