Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / বিনোদন

মনোজ কুমারের জীবনাবসান

মনোজ কুমারের জীবনাবসান
  • ৫ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পর্দায় ৮০ বছরের এক ভিক্ষুক। প্রথম দর্শনেই তাঁর সেই অনবদ্য অভিব্যক্তি চমকে দিয়েছিল। খুবই ছোট চরিত্র। কিন্তু ১৯৫৭-এ মুক্তি পাওয়া ‘ফ্যাশন’ ছবির সেই ভিক্ষুক যে বাস্তবে বছর ১৯-এর তরুণ, তা অভিনয় দেখে বোঝার উপায় ছিল না। বলিউডের উত্থান পতনের আঙিনায় হরিকৃষণ গিরি গোস্বামীর পথচলার সেই শুরু। চলচ্চিত্রের দাবি মেনে পরবর্তীতে ‘মনোজ কুমার’ নামটি বেছে নিয়েছিলেন তিনি। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে শুরু হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়। সেই গৌরবের পথচলারই পরিসমাপ্তি ঘটল শুক্রবার। প্রয়াত হলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা মনোজ কুমার। মুম্বইয়ের কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ৮৭ বছর বয়সি অভিনেতা দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। ফেব্রুয়ারির শেষ থেকেই ভর্তি ছিলেন হাসপাতালে। 

Advertisement

দেশাত্মবোধক ছবির সাফল্যকে পাথেয় করেই একসময় বলিউডে মনোজ কুমারের জনপ্রিয়তা পৌঁছেছিল শিখরে। অভিনয়ে দেশ ও দেশাত্মবোধ একাকার হতেই ‘ভারত কুমার’ বলেও সম্বোধন করা হতো তাঁকে। প্রয়াত অভিনেতার পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি এক্স হ্যান্ডেলে জানিয়েছেন, দেশাত্মবোধক ছবির মধ্যে দিয়ে বর্ষীয়ান অভিনেতা যেভাবে দেশের প্রতি ভালোবাসা জানিয়েছেন, তা সবাই মনে রাখবে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন ‘শেষ দিন পর্যন্ত মনোজ কুমারের দেশের প্রতি ভালোবাসা ছিল অটুট। তাঁর মৃত্যু চলচ্চিত্র জগতের জন্য বিরাট ক্ষতি।’ প্রয়াত অভিনেতার পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন পুরনো সহকর্মী থেকে আজকের কলাকুশলীরা। আজ, শনিবার মুম্বইয়ে বরেণ্য অভিনেতার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে বলে পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে। 
১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অ্যাবটাবাদে (অধুনা পাকিস্তান) এক পাঞ্জাবি ব্রাহ্মণ পরিবারে মনোজের জন্ম। দেশভাগের সময় ১০ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গেই দিল্লি চলে আসেন তিনি। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই ১৯৫৬ সাল নাগাদ মুম্বই পাড়ি দেন। ১৯৫৭ সালে প্রথম ছবি মুক্তি পায় তাঁর। ডেবিউ ছবিতে নজরে পড়ার পর আরও সুযোগ আসতে থাকে। একে একে ‘সাহারা’ (১৯৫৮), ‘চাঁদ’ (১৯৫৯), ‘হনিমুন’ (১৯৬০)-এ অভিনয় করেন। ‘কাচ কি গুড়িয়া’ (১৯৬১)-এ প্রথম মুখ্য চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন মনোজ। ওই একই বছরে ‘পিয়া মিলন কি আস’, ‘সুহাগ সিন্দুর’ এবং ‘রেশমি রুমাল’ মুক্তি পায়। ১৯৬২-তে মুক্তি পাওয়া ‘হরিয়ালি অউর রাস্তা’ ছবিটি মনোজকে প্রথম ব্যবসায়িক সাফল্যের মুখ দেখিয়েছিল। মালা সিনহার বিপরীতে তাঁর অভিনয় সর্বস্তরে প্রশংসা পেয়েছিল। ১৯৬৪-তে মুক্তি পাওয়া রাজ খোসলার রহস্য থ্রিলার ‘উও কৌন থি’ মনোজের কেরিয়ারে সাফল্যের নতুন মোড় এনে দেয়। মদন মোহনের কম্পোজিশনে ‘লগ যা গলে’ এবং ‘নয়না বরষে রিমঝিম’-এর মতো ছবির গান আজও দর্শকের মুখে মুখে ফেরে। 
১৯৬৫ মনোজের কেরিয়ারে যেন বসন্ত। তাঁর প্রথম দেশাত্মবোধক ছবি ‘শহিদ’ মুক্তি পেয়েছিল। ভগৎ সিংয়ের জীবনের উপর তৈরি এই চলচ্চিত্র মনোজের ভবিষ্যৎ সাফল্যের ভিত গড়ে দেয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীও ওই ছবির ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। ওই বছরেরই শেষের দিকে রহস্য থ্রিলার ঘরানার ছবি ‘গুমনাম’-এ ফের বক্স অফিস হিটের স্বাদ পেয়েছিলেন মনোজ। কখনও আশা পারেখের সঙ্গে জুটি বেঁধে ‘দো বদন’, কখনও বা শর্মিলা ঠাকুরের বিপরীতে ‘শাওন কি ঘটা’— মনোজ একের পর এক ভিন্ন স্বাদের চরিত্র উপহার দিয়েছেন বলিউড দাপিয়ে। 
১৯৬৫-র ইন্দো পাক যুদ্ধের পর লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ‘জয় জওয়ান জয় কিষাণ’ স্লোগানের কথা মাথায় রেখে মনোজকে একটি ছবি তৈরির জন্য অনুরোধ করেন। ফলস্বরূপ পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ ঘটে তাঁর। তৈরি হয় দেশাত্মবোধক ছবি ‘উপকার’ (১৯৬৭)। যা তাঁকে এনে দিয়েছিল জাতীয় পুরস্কারের সম্মান। সেই ছবির ‘মেরে দেশ কি ধরতি’ গানটি আজও সাধারণতন্ত্র ও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়। ‘ক্রান্তি’, ‘পূরব অউর পশ্চিম’, ‘রোটি কাপড়া অউর মকান’-এর মতো ছবিতেও তাঁর অভিনয় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯৯৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ময়দান-এ-জং’ ছবিতে শেষবার অভিনয় করেছিলেন মনোজ। 
দীর্ঘ অভিনয় জীবনে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা। জাতীয় পুরস্কারের পাশাপাশি ১৯৯২-এ পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন তিনি। চলচ্চিত্রে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য ২০১৫ সালে দাদসাহেব ফালকে পুরস্কার পেয়েছিলেন। অভিনয় জীবনে আগাগোড়া দিলীপ কুমারের প্রভাব নিজেই স্বীকার করেছিলেন তিনি। এমনকী পিতৃদত্ত নাম বদলে ফেলার নেপথ্যেও ছিলেন দিলীপ কুমার। ১৯৪৯-এ মুক্তিপ্রাপ্ত ‘শবনম’-এ দিলীপ কুমারের চরিত্রের নাম ছিল ‘মনোজ কুমার’। সেই নামই পরবর্তীকালে হরিকৃষণের অভিনেতা সত্তার পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। শুক্রবার অভিনেতার বাসভবনে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন তাঁর সহ অভিনেতা ধর্মেন্দ্র, প্রেম চোপড়া  সহ বলিউডের বহু তারকা। মনোজের প্রয়াণে নিঃসন্দেহে বলিউডের এক গৌরবময় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হল বলেই মনে করছেন তাঁর গুণগ্রাহকরা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ