


বিশেষ নিবন্ধ, হারাধন চৌধুরী: ‘‘বন থেকে জানোয়ার তুলে আনা যায়, কিন্তু জানোয়ারের মন থেকে বন তুলে ফেলা যায় না।’’ —‘বনের ধারে’ গল্পে লিখেছিলেন লীলা মজুমদার।
***
মহালয়া মিটতেই, বহু প্যান্ডেলে পুজোর উদ্বোধন হয়ে যায়। অর্থাৎ ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় দেবীর বোধনের আগেই পুজোর শুরু। পশ্চিমবঙ্গে ভোট দুর্গাপুজোর মতোই একটা বড়ো ব্যাপার। ১৫ মার্চ, রবিবার জাতীয় নির্বাচন কমিশন দেশের পাঁচ জায়গায় বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করেছে। কিন্তু তার একদিন আগেই, শনিবার কলকাতা মহানগরের বুকে ঘটে গেল ধুন্ধুমার কাণ্ড। গিরিশ পার্ক এলাকায় রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজার বাড়িতে হল বেপরোয়া, বেনজির হামলা। অভিযুক্তরা গেরুয়া ক্যাডার। অর্থাৎ দেশ দেখল বাংলায় শুরু হয়ে গিয়েছে নির্বাচনি সংঘর্ষ! সম্পূর্ণ ভোটার তালিকা তৈরি, নির্বাচন ও প্রার্থী তালিকা ঘোষণা এবং দেওয়াল লিখনের আগেই। সৌজন্যে মোদির ব্রিগেড সভা।
ভোট মানেই বাংলায় একটা আলাদা ব্যাপার। ভোটের ঢাকে কাঠি পড়ার আগে থেকেই টগবগ করে ফুটতে থাকে গোটা রাজ্য। তার উপর ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচন দিয়েছে আলাদা মাত্রা। এর কারণ, একদিকে রেকর্ড আসনে জিতে নবান্ন পুনর্দখলের চ্যালেঞ্জ তৃণমূলের, অন্যদিকে বঙ্গজয়ের জন্য বিজেপিরও মরিয়া ভাব। আমরা জানি, ১৯৭৭ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে রাইটার্স দখল করেছিল বামফ্রন্ট। শুধু বিধানসভা নয়, পঞ্চায়েত, পুরসভা থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কলকারখানা, সমবায়, এমনকি কলোনি কমিটি পর্যন্ত সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সিপিএমের একচ্ছত্র আধিপত্য। বস্তুত সারা বাংলাকে চৌত্রিশ বছর যাবৎ এক চক্রব্যূহে আবদ্ধ করে ফেলা হয়েছিল। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাকে সেখান থেকেই উদ্ধার করেন। সেবার তাঁর দল তৃণমূল একা ১৮৪ আসনে জয়লাভ করে। মেহনতি মানুষের মুক্তির খোয়াব দেখিয়ে ক্ষমতা দখল করলেও, এই ব্যাপারে কারো দ্বিমত ছিল না যে, সিপিএম বাংলাটাকে সর্বার্থে শ্মশান বানিয়ে গিয়েছে। মানুষ জানত, বাংলার এই বেহাল দশা ঘোচাতে মমতার সুশাসন আরো কিছুকাল চাই। তাই ২০১৬ সালে মমতাকে বাংলার মানুষ উপহার দিয়েছিল ২১১টি আসন। একুশে জয়ের হাসি আরো চওড়া হল বাংলার আপামর মানুষের আশীর্বাদে—তৃণমূল পেল ২১৫টি আসন। মমতার দলের জয়ের ধারা অব্যাহত ছিল পরবর্তী উপনির্বাচনগুলিতে এবং বিরোধী পক্ষের একাধিক বিধায়কও পরে তৃণমূলে নাম লিখিয়েছেন। সব মিলিয়ে তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা এখন আরো কিছুটা বেশি। জোড়াফুল ব্রিগেড অন্তত আড়াইশো আসন জয়ের লক্ষ্যে এবার ভোটযুদ্ধে নেমেছে। অর্থাৎ অতীতের সমস্ত দল বা জোটের যাবতীয় রেকর্ড ম্লান করে দেওয়ারই চ্যালেঞ্জ তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের সামনে রেখেছেন নেতৃত্ব।
একুশের নির্বাচনেও মরিয়া ছিল বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, দলের তৎকালীন সভাপতি জগৎপ্রকাশ নাড্ডাসহ একঝাঁক হেভিওয়েট নেতা নিজেদেরকে দিল্লি-কলকাতা ডেইলি প্যাসেঞ্জারের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছিলেন। গেরুয়া কর্মী-ক্যাডার-সমর্থকদের উদ্বুব্ধ করতে তাঁরা শুনিয়েছিলেন ‘দুশো পার’-এর গল্প। কিন্তু বাস্তবে কী দেখা গেল? সংঘের অশ্বমেধের ঘোড়া দুশো বহুদূর, একশোরও অনেক আগে, মাত্র ৭৭-এ পৌঁছেই মুখ থুবড়ে পড়ল! অবিকল ঝাঁঝ বজায় রেখে বিজেপি নির্বাচনি লড়াইয়ে নেমেছিল ২০২৪ লোকসভাতেও। সেখানেও তারা কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের মুখ দেখেনি। বরং রেজাল্ট খারাপ হয়েছিল ২০১৯-র তুলনায়। ২০২১-এর পর থেকে এ-পর্যন্ত অনুষ্ঠিত একাধিক উপনির্বাচনেও গেরুয়া শিবিরকে বাংলা হতাশ করেছে। তার উপর রয়েছে—ভয়ানক সাংগঠনিক দুর্বলতা। সব ব্যাপারে দিল্লি-নির্ভরতা। ডবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলিতে বাংলা-বাঙালি কেন্দ্রিক মর্মান্তিক স্মৃতি। বিজেপি ও মোদি সরকারের ‘জুমলা’ নিয়ে মানুষের ক্রমবর্ধমান বিতৃষ্ণা। সিএএ ‘প্রকল্প’ সুপার ফ্লপ।
এত এত ক্ষত কি এত দ্রুত সারানো সম্ভব? এদিকে দলের ভিতরেই ‘হয় এবার নয় নেভার’ আওয়াজ উঠেছে! কারণ তাদের ধারণা, মোদি জমানায় পদ্মপার্টির বাংলা দখলের এটাই সর্বশেষ সুযোগ। বিজেপির প্রতিষ্ঠাতাপুরুষই নাকি হিন্দু বাঙালিকে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ পাইয়ে দিয়েছেন। কিন্তু স্রষ্টার রাজ্যে ব্রাত্য স্রষ্টারই দল! এই গ্লানি বিজেপির পক্ষে দুঃসহ। এমন অনুমান অসংগত নয় যে, মুখরক্ষার দাওয়াই খুঁজে হয়রান বিজেপিই আবিষ্কার করেছে এসআইআর নামক হাতিয়ারটি। মেরুকরণের ফসল ঘরে তোলাই এর উদ্দেশ্য। নির্বাচনে একাধিক রাজ্যে সংখ্যালঘু ভোটদাতাদের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ অগ্রভাগে। এরাজ্যের মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার প্রায় তিনভাগের একভাগ। বস্তুত উত্তরপ্রদেশের পর পশ্চিমবঙ্গেই সবচেয়ে বেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। ২০১১ সালের সেন্সাস অনুসারে, বাংলার ২৩টি জেলার মধ্যে মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর, দুই ২৪ পরগনা, বীরভূম, নদীয়া, হাওড়া, কোচবিহার প্রভৃতি জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা ২৫ শতাংশের বেশি। গত একদশকে এই ভারসাম্য আরো বদলে গিয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের অনুমান। রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ১৬০টি রয়েছে উপর্যুক্ত নয়টি জেলায়। জ্যোতি বসু মুসলিম ভোটের গুরুত্ব জানতেন। এটাকে যতদিন ভোটব্যাংক হিসেবে রক্ষা করতে পেরেছিলেন, ততদিন সিপিএম তথা বামফ্রন্টের কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। ২০১১ সালে বামেরা ওই দুর্গ রক্ষায় ব্যর্থ হয়। সেবার মমতার নেতৃত্বে তৃণমূলের বিপুল জয়ের নেপথ্যে ছিল সংখ্যালঘু ভোটারদের অকুণ্ঠ আশীর্বাদ।
মমতার প্রতি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আস্থা আজও প্রশ্নাতীত। সাম্প্রতিক অতীতে অনুষ্ঠিত একাধিক নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোট বিশ্লেষণ থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মুসলিম ভোটের প্রায় কিছুই বিজেপির ঝুলিতে ঢুকছে না। বিজেপিওয়ালারা বেশ বুঝে গিয়েছে, বাংলায় সংখ্যালঘু ভোট বাদ দিয়েই তাদের নির্বাচনি লড়াই দিতে হবে। তাদের মূল ভরসা হিন্দু ভোট। হিন্দু ভোট এককাট্টা করতে না পারলে গেরুয়া শিবির ক্ষমতার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারবে না। আবার এখানে হিন্দু ভোট এককাট্টা হওয়াও অসম্ভব। তার কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমাজকল্যাণমূলক সরকারি প্রকল্পগুলির বেনিফিসিয়ারি হিন্দু, মুসলিমসহ সকলেই। তাই বিজেপি ঘুঁটি সাজাচ্ছে মুসলিম ভোটকে মাইনাস ধরেই। মমতার দলের প্রার্থীরা ঢালাও সংখ্যালঘু ভোট পান। তৃণমূলের জয়ের চওড়া মার্জিন ওই ভোটে বহুলাংশে নির্ধারিত হয়। তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জব্দ করার সহজ ফন্দি কী হতে পারে? মুসলিম ভোটার কমিয়ে ভোটার তালিকা তৈরি হলেই কেল্লা ফতে বলে মনে করে বিজেপির অনেকে। বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়েছে সংখ্যালঘু প্রভাবিত পাঁচটি জেলাকে। উত্তর দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং দুই ২৪ পরগনায় বাদ গিয়েছে ২৩ লক্ষ নাম এবং ‘বিচারাধীন’ ৩৫ লক্ষ! একুশের ভোটে এই জেলাগুলিতে বড়োসড়ো ব্যবধানে জয় পেয়েছিল তৃণমূল। এসআইআরে সেখানকার ১০৫টি আসনে যত নাম বাদ গিয়েছে, তার সঙ্গে ‘বিচারাধীন’ ভোটারের সংখ্যা যোগ করলেই তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান মুছে যায়! সিএএ প্রকল্পে হিন্দুভোট বৃদ্ধির ফন্দি বানচাল হতেই এসআইআরে বেশি করে শান দিতে হয়েছে বিজেপিকে। ফয়সালা এখনো বিশ বাঁও জলে। অসম্পূর্ণ ভোটার তালিকা হাতে নিয়েই ভোট ঘোষণা হল বেনজিরভাবে।
বাংলায় ব্রিগেড সভা হল যেকোনো দলের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্মসূচি। শনিবারের ব্রিগেড সভার গুরুত্ব ছিল অনেকখানি। কারণ আয়োজক বিজেপি, বাংলায় প্রধান বিরোধী দল, যারা আগামী দিনে এরাজ্যে শাসক হওয়ার খোয়াব দেখে। এটা প্রধানমন্ত্রীর দল। সভার প্রধান বক্তা নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। তাই বিজেপির বিশেষ দায়িত্ববোধ প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু শনিবার অভিযোগ উঠল যে লাঠি, বোমা, ইট, বোতল প্রভৃতি নিয়ে জনসভায় গিয়েছিল ক্যাডাররা! যাওয়ার পথে গুন্ডামিও করল একদফা। ছাড় পেলেন না মহিলা মন্ত্রী থেকে মহিলা পুলিশ কর্মীরাও। ব্রিগেডের নামে কলকাতাকে রক্তাক্ত করা হল! দলটি কোন ‘পরিবর্তন’-এ বিশ্বাসী সেটাই খোলসা হয়ে গেল না কি সেদিন? লজ্জিত হওয়ার পরিবর্তে, এই গুন্ডামির পর, বুক ফুলিয়ে গর্ব করেছেন বিজেপির একাধিক নেতা। এমনকি তাঁরা ইঙ্গিতপূর্ণ হুমকিও দিয়েছেন যে, তৃণমূলকে শায়েস্তা করতে আগামী দিনে তাঁরা ‘কালীঘাট’ এবং ‘চেতলা’র দিকেও পা বাড়াবেন!
আর এই আকচাআকচিরই মধ্যে অতিসক্রিয়তা দেখাল জাতীয় নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন ঘোষণার ঘণ্টাকয়েকের মধ্যে, রবিবার মধ্যরাতে সরিয়ে দেওয়া হল রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং স্বরাষ্ট্রসচিবকে। পরদিন সকাল হতে না হতেই খবর এল কোপে পড়েছেন শীর্ষ পুলিশকর্তারাও। একযোগে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে কলকাতার সিপি, রাজ্য পুলিশের ডিজি, এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) এবং ডিজি (কারা)-কে! ইসিআইয়ের তরফে পাইকারি হারে প্রশাসনিক কর্তা বদলের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বেনজির।
হিংসামুক্ত নির্বাচন অবশ্য চাই। কিন্তু তার জন্য নির্বাচিত রাজ্য সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নাকচ করে দিতে হবে? সত্যিই আজব ব্যাপার! সোজা কথায়, এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিপক্ষ শুধু বিজেপি বা মোদি বাহিনী নয়, জাতীয় নির্বাচন কমিশনও। গত পাঁচবছর তৃণমূলকে লাগাতার লড়তে হয়েছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে। আর নির্বাচনের আবহে তার সঙ্গে যুক্ত হল ইসিআই—একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী! তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল ভরসা মানুষ। তিনি মানুষকে সঙ্গে নিয়ে মানুষের জন্যই বারোমাস ২৪×৭ রাজনীতি করেন। এই প্র্যাকটিস তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের। কমিশন কিছু আমলাকে সাময়িক বিড়ম্বনায় ফেলতে পারে, কিন্তু তাঁরা তো সকলের হয়ে ভোট দেন না। মানুষ নিজের ভোট নিজে দেবে। প্রতিটি ভোটের মূল্যমানও সমান। তাদের মন জুড়ে আছে মমতার নাম। সে নাম সরাবে কে? এই প্রসঙ্গেই মনে আসে লীলা মজুমদারের ‘বনের ধারে’ গল্পটির সারার্থ—‘‘বন থেকে জানোয়ার তুলে আনা যায়, কিন্তু জানোয়ারের মন থেকে বন তুলে ফেলা যায় না।’’ বনই হল পশুপাখির জন্মভূমি মাতৃভূমি বা মা। নিষ্ঠুর ব্যাধ তাদের খাঁচাবন্দি করলেও তাদের মনে ব্যাধের কোনো জায়গা হয় না, তাদের মনজুড়ে থাকে বনেরই শান্তি মায়া মমতা। ভারত যদি ইলেক্টোরাল অটোক্রেসির নিন্দা ঘোচাতে আন্তরিক হয় তবে মমতার দেখানো পথেই গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই চালাতে হবে তামাম ভারতকে।