Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাঙালির অস্মিতা জিতলে ফিরছেন মমতাই

কোন কোন গ্রহের মিলন ঘটবে কিংবা কোন গ্রহ বিপরীত গতি নেবে তা আমি জানি না। তবে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে এটুকু নিশ্চিয় করেই বলতে পারি যে, ‘আমরা একটি কৌতূহলোদ্দীপক সময় অতিক্রম করছি।’

বাঙালির অস্মিতা জিতলে ফিরছেন মমতাই
  • ৬ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: কোন কোন গ্রহের মিলন ঘটবে কিংবা কোন গ্রহ বিপরীত গতি নেবে তা আমি জানি না। তবে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে এটুকু নিশ্চিয় করেই বলতে পারি যে, ‘আমরা একটি কৌতূহলোদ্দীপক সময় অতিক্রম করছি।’

Advertisement

পরস্পরবিরোধী মৌলিক আদর্শসমূহ অসম, কেরল, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরি, তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন আগামী ৯ এবং ২৩ ও ২৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলির মধ্যে এই প্রথম—কেরল, তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির দীর্ঘস্থায়ী ও সুপ্রতিষ্ঠিত ‘বাম-মধ্যপন্থী’ রাজনৈতিক দলগুলির সামনে চ্যালেঞ্জ হিসাবে উপস্থিত হয়েছে। আদর্শগত পরিসর থেকে বলা যায় যে, কেরলের ইউডিএফ এবং এলডিএফ—উভয় জোটই রাজনৈতিক কেন্দ্রের বাম দিকে অবস্থান করছে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকের নেতৃত্বাধীন জোট (যার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কংগ্রেস) এবং পশ্চিমবঙ্গে এআইটিসি বা তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)—উভয় দলই নিজেদের স্পষ্টভাবে ‘বাম-মধ্যপন্থী’ হিসাবে ঘোষণা করে থাকে। এই দলগুলির প্রতিটিই সংবিধান, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, সংসদ বা আইনসভার প্রাধান্য, ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, সমতাভিত্তিক উন্নয়ন, জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং উদার অর্থনীতির প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল। বর্তমানে এলডিএফ, ডিএমকে এবং তৃণমূল কংগ্রেস—এই দলগুলিই নিজ নিজ রাজ্যে সরকার পরিচালনা করছে। 
অন্যদিকে, চ্যালেঞ্জার বা প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়েছে বিজেপি, যারা আদর্শগত পরিসরের ঠিক ‘ডান দিকে’ নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেছে। আমার বিবেচনায় আদর্শগতভাবে বিজেপির চেয়েও অধিক ‘ডানপন্থী’ হিসাবে কেবল আরএসএসের কথাই মনে আসে। অবশ্য আরএসএস দাবি করে যে, তারা কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তবে তারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও এটুকু স্বীকার করে নেয় যে, তাদের বিশিষ্ট নেতারা অতীতেও বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন এবং বর্তমানেও রয়েছেন। তাছাড়া বিজেপি সরকারের অনেক মন্ত্রীই একসময় আরএসএসের ‘প্রচারক’ ছিলেন এবং এখনো তাঁরা সক্রিয় রয়েছেন ‘স্বয়ংসেবক’-এর ভূমিকায়। সাধারণ নাগরিকের দৃষ্টিতে আরএসএস হল ‘অভিভাবক’ বা মূল সংগঠন এবং বিজেপি হল তার ‘সন্তান’ বা রাজনৈতিক শাখা। বিজেপির নীতি ও আইনগুলি মূলত হিন্দু আধিপত্যবাদ (হিন্দুত্ব), বৈদিক শাস্ত্র ও রীতিনীতির প্রতি অবিচল আস্থা, আর্য সভ্যতা বা সংস্কৃতি, কেন্দ্রীয়করণ, শাসন বিভাগের (এগজিকিউটিভ) প্রাধান্য, একটি অভিন্ন ভাষা (হিন্দি), নিরামিষভোজী জীবনধারা, ‘এক জাতি এক সরকার’ নীতি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ‘চেইবোল’-এর আদলে গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ ও সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলির ধারণার উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সেই রাজনৈতিক ঐকমত্য বা সহমতের ধারা থেকে সচেতনভাবেই সরে এসেছে, যা ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভারতের রাজনীতিতে বহাল ছিল। 
উপর্যুক্ত তিনটি রাজ্যে আসন্ন যে নির্বাচনি লড়াই হতে চলেছে, তা মূলত ‘বাম-মধ্যপন্থী’ এবং ‘ডান-মধ্যপন্থী’ রাজনৈতিক জোট বা শক্তিগুলির মধ্যকারই এক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে। 
কেরল 
গত পঞ্চাশ বছর যাবৎ কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ এবং সিপিএম নেতৃত্বাধীন এলডিএফ কেরলে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছে। ছোটো দলগুলি পালাক্রমে এই দুই জোটের কোনো-না-কোনোটির দিকে ঝুঁকেছে। কেরলের ভোটাররা সাধারণত ইউডিএফ এবং এলডিএফের মধ্যে পালাবদল ঘটিয়েছেন। কিন্তু ২০২১ সালে তাঁরা সেই চিরাচরিত ধারা ভেঙে দেন। ২০১৬ সালে বিজয়ী এলডিএফকেই তাঁরা পুনরায় নির্বাচিত করেন। উভয় জোটই বেশ শক্তিশালী এবং তারা তাদের নির্বাচনি কৌশলগুলিকে আরো ধারালো করে তুলেছে। সাধারণ মানুষের ধারণা হল, বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বে এলডিএফ সরকার টানা দুটি মেয়াদ শাসন করেছে এবং এখন পরিবর্তনের সময় এসেছে। ২০১৮ সালের বন্যা এবং ২০২৪ সালের ওয়েনাড়ের ভূমিধস মোকাবিলায় এলডিএফ সরকারের অদক্ষ ও ব্যর্থ ভূমিকা দলটির ভাবমূর্তির মারাত্মক ক্ষতি করেছে। কংগ্রেস দলে অনেক দক্ষ এবং অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতা রয়েছেন। তাই ইউডিএফ এবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করবে বলে তারা বেশ আত্মবিশ্বাসী। 
বিজেপি যেন কেরলের মানুষের মনন বা ‘ডিএনএ’ বুঝতেই পারছে না। বিজেপি শেষ পর্যন্ত কতগুলি আসনে জয়লাভ করতে পারবে? এ নিয়ে এখন জোর জল্পনা-কল্পনা চলছে। তবে অধিকাংশ লোকের বাজি হল, তাদের আসন সংখ্যা এক অঙ্কের ঘরেই (দশটির কম) সীমাবদ্ধ থাকবে। 
তামিলনাড়ু 
২০২১ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটটি এখনো অটুট রয়েছে। এবং, এম কে স্ট্যালিন ছোটো দলগুলিকে রাজি করিয়ে নিজের দলের প্রতীক নিয়েই নির্বাচনে লড়তে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এই কৌশলের ফলে বিরোধী ভোটগুলি আর বিক্ষিপ্ত হবে না বা ভাগ হয়ে যাবে না। ২০২১ সালের বিধানসভা এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটের ভোটব্যাংকে কিছুটা ধস নামলেও, তারা এআইএডিএমকের উপদল এএমএমকের সমর্থন লাভ নিশ্চিত করে ফেলেছে। মজার ব্যাপার হল, মাত্র একমাস আগেই এএমএমকে শপথ নিয়ে বলেছিল যে, তারা কখনোই ই পালানিস্বামীকে এআইএডিএমকের নেতা কিংবা জোটের মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে মেনে নেবে না! 
এআইএডিএমকের জন্য বিজেপি আসলে কী নিয়ে আসছে? নিশ্চিত করেই বলা যায়: কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা। বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ। নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) পরোক্ষ বা নীরব সমর্থন। এবং বিজেপির জাতীয় নেতাদের সেই বিভেদ সৃষ্টিকারী বাগাড়ম্বর। যদিও ২০২১ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই বিষয়গুলি কোনো কাজে আসেনি। আর সম্ভবত, ২০২৬ সালের নির্বাচনেও এগুলি কোনো সুফল বয়ে আনবে না। ২৩৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে মাত্র ২৭টিতে।  কিন্তু দলটি শেষপর্যন্ত কতগুলি আসনে জিতবে, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার পরিসরটি এক থেকে দশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। 
‘তামিলগা ভেত্তরি কাজাগাম’ (টিভিকে, যার প্রতিষ্ঠাতা জোসেফ বিজয়) এবং ‘নাম তামিঝার কাটচি’ (যার নেতৃত্বে রয়েছেন সমস্ত রাজনৈতিক দলেরই একজন কড়া সমালোচক)। এই দুই দলের উপস্থিতি এবং তাদের ভোট বিভাজনের ক্ষমতা, প্রতিটি আসনের নির্বাচনি লড়াইকে বেশ হাড্ডাহাড্ডির জায়গায় নিয়ে যাবে। তবে সামগ্রিক ফলাফলটি শেষমেশ কোনো একটি জোটের পক্ষেই যাবে। নির্বাচনি পর্যবেক্ষক এবং প্রবীণ সাংবাদিকদের অভিমত হল, ডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটই ফের ক্ষমতাসীন হবে। 
পশ্চিমবঙ্গ
এটি কার্যত ক্ষমতাসীন অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসে (টিএমসি) এবং তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির মধ্যে একটি সরাসরি লড়াই হতে যাচ্ছে। অনুমান করা যায় যে, কংগ্রেস এবং সিপিএমের মতো বাংলায় একদা ক্ষমতাসীন দলগুলি আক্রমণের মূল লক্ষ্য হিসেবে বিজেপিকেই বেছে নেবে। তবে তাদের এমন রাজনৈতিক নিশানা ভোটের চূড়ান্ত ফলাফলের উপর কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারবে বলে মনে হয় না। এই লড়াইটি অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করেছে সেই চিরন্তন যোদ্ধা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর নাছোড়বান্দা প্রতিদ্বন্দ্বী জুটি মোদি ও শাহের মধ্যে। এই নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল রাজনৈতিক গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা এখন এক শারীরিক, রূঢ় এবং আবেগঘন রূপ ধারণ করেছে। এটি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনে তাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য, ভাষা, জীবনবোধ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, দেশপ্রেম এবং স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও অমর্ত্য সেনের মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রক্ষার এক প্রবল উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলেছে। যদি বাঙালির গর্ব ও আত্মমর্যাদাবোধ শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল টানা চতুর্থবারের মতো বিজয়ের মুকুট পরবেন। 
এই রাজ্য তিনটি ‘হিন্দি বলয়’ বা হিন্দিভাষী অঞ্চলের বাইরে অবস্থিত। প্রতিটি দলের নির্বাচনি ফলাফলই তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ভাগ্যের উপর হয় সাফল্যের দ্যুতি ছড়াবে, নতুবা ফেলবে ব্যর্থতার ছায়া। বিশেষ করে বিজেপির ক্ষেত্রে বিষয়টি অধিকতর প্রাসঙ্গিক। কারণ, এই দুটি অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে বিজেপিকে অনেকেই একটি ‘বহিরাগত’ শক্তি হিসেবেই গণ্য করে থাকেন।
 লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ