নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাকপুর: কয়েক দশকের মধ্যে থানায় প্রথম রাজনৈতিক মৃত্যু। তাও পালাবদলের পরই। এ নিয়ে শনিবার থেকেই উত্তাপ চড়ছিল রাজনৈতিক মহলে। কিন্তু রবিবার হালিশহর থানার লক আপে মৃত তৃণমূল কর্মী বিরজু কেয়টের বাড়িতে নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পৌঁছাতেই গোটা বিষয়টা অন্য মাত্রা নিল। মমতার সঙ্গে ছিলেন সাংসদ দোলা সেন এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। হালিশহরের ভূতবাগানের প্রমোদনগরের ওই বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হলেন মমতা। তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে ছোড়া হল ইট, জুতো, কাদা, এমনকি জলের বোতলও। সঙ্গে চোর চোর স্লোগান। এবং সবটাই হল পুলিশের উপস্থিতিতে। বিনা বাধায়। তৃণমূলের অভিযোগ, স্থানীয় বিজেপি বিধায়কের ঘনিষ্ঠ কর্মী-সমর্থকরাই এই হামলা চালিয়েছে। ভিডিয়োয় তাদের চিহ্নিতও করেছে তৃণমূল। রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য এই ঘটনায় বিজেপি কর্মীদের থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘পাথর-কাদা ছোড়া মেনে নেওয়া যায় না। এই সংস্কৃতি তৃণমূলের। এর সঙ্গে বিজেপির কোনো যোগ নেই।’ তবে পুলিশ ইতিমধ্যে একটি মামলা রুজুর পর তদন্ত শুরু করেছে।
মমতা এদিন বিজেপির ওই বিক্ষোভ এবং ‘হামলা’ উপেক্ষা করেই নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়ির দিকে এগিয়ে গিয়েছেন। স্লোগান, গালাগালি সত্ত্বেও ফিরে যাননি। সেখানে গিয়ে কথা বলেছেন মৃতের দাদা শম্ভু কেয়টের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা দাহ করে ভোর চারটে বাড়ি ফিরেছি। পুলিশি নির্যাতনে দাদার মৃত্যু হয়েছে। আমরা বিচার চাইছি। দেখি কী হয়?’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে জানান, ‘আমরা আপনাদের পাশে আছি। আদালতের দ্বারস্থ হব।’ যদিও শম্ভুবাবু মমতাকে বলেন, তাঁরা পুলিশ-প্রশাসনেই ভরসা রাখছেন। আর কিছু তাঁদের চাই না। এমনকি, মমতার সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করেননি প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলার তথা বিরজুর স্ত্রী জেনি শর্মা কেওট। কারণ কী? পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসার আগে বাড়িতে গিয়েছিলেন স্থানীয় বিধায়ক সুদীপ্ত দাস। পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তারপরই জেনি শর্মা আর মমতার সামনে আসেননি। তবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ‘সকালেও জেনির সঙ্গে কথা হয়েছিল। যিনি আমাদের দলের কাউন্সিলার ছিলেন, কাল পর্যন্ত পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন, এখন বদলে গেলেন কেন? বিজেপির চাপে? লুম্পেনদের ভয়ে? এদিন যেভাবে আমার গাড়িতে হামলা হল তাতে স্পষ্ট, বিজেপি আমাকে মেরে ফেলতে চায়। বাংলা এখন লুম্পেনদের হাতে। পুলিশ তাদের প্রোটেকশন দিচ্ছে।’
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য বলেছেন, ‘প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জেড প্লাস সিকিওরিটি পান। কিন্তু পুলিশকে না জানিয়ে ওখানে গিয়েছিলেন। তাও পুলিশ ভালো নিরাপত্তা ব্যবস্থা রেখেছিল। যা দেখলাম, পরিবার ওঁর সহযোগিতা চাইছে না। তাঁরা পুলিশের উপর আস্থা রাখছেন। পরিবার দরজা বন্ধ করে রেখেছে, আর উনি জোর করে ঢুকতে গেছেন। ওখানকার বিক্ষোভে বিজেপির পরিচিত কাউকে আমি দেখিনি।’ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেছেন, ‘বিজেপির কেউ যদি এই হামলার নেপথ্যে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ পুলিশ ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী বিরজুর মৃত্যুর তদন্ত হবে। স্থানীয় বিধায়ক সুদীপ্ত দাসও বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে এলাকায় বড়ো হয়েছি। একসঙ্গে খেলাধুলা করেছি। কখনোই এমন মৃত্যু সমর্থনযোগ্য নয়।’ জাতীয় স্তরে পরিস্থিতি অবশ্য তীব্র আকার ধারণ করেছে। মমতার উপর হামলার পরই দেশজুড়ে সরব হয়েছেন বিরোধী নেতানেত্রীরা। কংগ্রেস, সিপিএম, আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়াল, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব, প্রত্যেকেই নিন্দা করেছেন। বিরোধী রাজনীতির পারদ চড়ছে। লাগাতার।