সুদীপ্ত কুণ্ডু, হাওড়া: একই পরিবারে হয় তিন-তিনটি দুর্গাপুজো। এই তিন পুজোর আয়োজন ঘিরে মেতে ওঠে গোটা গ্রাম। হাওড়ার মাকড়দহে শতবর্ষ প্রাচীন বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের বড়োবাড়ি, মনসাতলা ও নতুন বাড়ির পুজোর নেপথ্যে রয়েছে বর্গির ভয়ে ভিটে হারানোর ইতিহাস।
মাকড়দহে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের বসবাস শুরু হয় বংশের আদিপুরুষ জগদীশ বাচস্পতির আগমনের সঙ্গে। তাঁর নিবাস ছিল হুগলি জেলার বাগাণ্ডা গ্রামে। পদবী বন্দ্যোপাধ্যায় হলেও জগদীশবাবুদের উপাধি ছিল বাচস্পতি। তিনি ছিলেন কনৌজ থেকে বাংলায় আসা শাস্ত্রজ্ঞ কুলীন ব্রাহ্মণদের মধ্যে একজন। ১৭৪২ সালে বর্গী আক্রমণের সময় ভিটে ছেড়ে হাওড়ার মাকড়দহের পূর্ব নওপাড়ায় আসতে বাধ্য হন তিনি। চরম দুঃসময়ে দাঁড়িয়েও আরাধ্য ইষ্টদেবতা অনন্তদেব শালগ্রাম শিলাকে সঙ্গে নিয়ে আসতে ভোলেননি তিনি। পরে মাকড়দহে পূর্ব নওপাড়া গ্রামেই দুর্গাপুজোর সূচনা করেন তিনি। যদিও প্রথম দুর্গাপুজোর সময়কাল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ‘বড়ো বাড়ির পুজো’ হিসেবেই পরিচিতি পেয়ে এসেছে এই দুর্গাপুজো। পরবর্তীতে একই গ্রামে ওই পরিবারের আরও দু’টি বাড়িতে পৃথক পুজো শুরু করেন উত্তরসূরিরা।
বড়ো বাড়ি, মনসাতলা এবং নতুন বাড়ি। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের এই তিন দুর্গাপুজোকে নিয়ে যেন উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে গোটা মাকড়দহ। তিন পুজোরই যাবতীয় নিয়ম উপাচার এক। বৃহৎনন্দীকেশ্বর পুরাণ অনুযায়ী শাক্ত মতে দেবীর আরাধনা করা হয় এখানে। প্রতিপদ থেকে নবমী
পর্যন্ত হয় চণ্ডীপাঠ। বহু আগে থেকেই সপ্তমী থেকে নবমী ও সন্ধিপুজোয় তিন বাড়িতেই পাঁঠা বলির প্রচলন ছিল। যদিও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিদিন দেবীকে অন্ন ভোগে দেওয়া হয় সাদা ভাত, খিচুড়ি, পায়েস ও পোলাও। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের ত্রয়োদশ তথা বর্তমান প্রজন্মের সদস্য রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘পুজোর চারদিন অনন্তদেব শালগ্রাম শিলাকে তিন বাড়িতেই নিয়ে যেতে হয়। পরপর তিন বাড়ির দুর্গা প্রাঙ্গণে পুজিত হন আমাদের কুলদেবতা। এই সময় বংশের তিন পরিবার যেন মিলেমিশে একাত্ম হয়ে যায়।’ আগে দশমীর দিন তিন বাড়ির প্রতিমা সরস্বতী নদীতে বিসর্জন দেওয়া হলেও বর্তমানে প্রতিটি বাড়ির পাশের পুকুরেই নিরঞ্জন করা হয়। গ্রামের রীতি অনুযায়ী, আজও একাদশীর বিকেলে গ্রামের সমস্ত দুর্গাপুজোর আয়োজকরা ষোড়শোপচারে পুজো দেন দেবী মাকড়চণ্ডীর মন্দিরে। নিজস্ব চিত্র