Bartaman Logo
২৮ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

দেবীপক্ষের সূচনায় মহালয়া

বঙ্গদেশ ছয় ঋতুর দেশ। ভাদ্র-আশ্বিন দু’মাস শরৎকাল। বর্ষা বিদায় নিচ্ছে শরৎ আসছে। বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অপরূপ শোভা।

দেবীপক্ষের সূচনায় মহালয়া
  • ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০

স্বামী হরিময়ানন্দ: বঙ্গদেশ ছয় ঋতুর দেশ। ভাদ্র-আশ্বিন দু’মাস শরৎকাল। বর্ষা বিদায় নিচ্ছে শরৎ আসছে। বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অপরূপ শোভা। শরৎ মানে কাশফুলের সাত্ত্বিক শুভ্রতা। জমি ধানখেত চারদিকে সবুজ আর সবুজ। দক্ষিণের বাতাসে ধান গাছগুলো হেলে দুলে আনন্দের শিহরন তুলছে। সকালে শিশির ভেজা দূর্বা ঘাসের সৌন্দর্য কাকে না মুগ্ধ করে? আর বিকেলের স্নিগ্ধ হাওয়ায় শান্তির শিহরন। ফুলের দিকে তাকান। শিউলি তো সকলের আগে চোখে পড়বে। রাতের অন্ধকারে ফুটে ঝরে পড়ে ভোরবেলায়। টগর, জবা, দোলন চাঁপা, মল্লিকা এরাও কম কী? আর কাশফুল। শরৎকাল কাশফুল এতো সমার্থক। নদীর ধার থেকে শুরু করে খাল-বিল সর্বত্র কাশফুলের সৌন্দর্য মুগ্ধ করে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। কবির ভাবনায়—

Advertisement

‘শরৎ, তোমার শিশির ধোওয়া কুন্তলে,
বনের পথে লুটিয়ে পড়া অঞ্চলে
আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি।’
সব মিলে শরতের অপরূপ রূপ, সৌন্দর্য হৃদয় ছুয়ে যায়। ঋতুর রানি শরৎ। আর শরতের রানি দেবী দুর্গা।
দেবী দুর্গা আসছেন। বাংলার ঘরে ঘরে মায়ের আগমনি বেজে উঠছে। মেঘহীন নীল আকাশ, কাশের ফুল হঠাৎ করে যেন সময়টা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একটা ছুটি ছুটি ভাব, একটা অবসর। পাড়ায় পাড়ায় মণ্ডপ তৈরির ব্যস্ততা। বাঁধাধরা জীবনযাত্রা থেকে একটা মুক্তির আস্বাদ। মা আসছেন এতেই যেন সর্বত্র আনন্দের স্পর্শ। মাকে আমরা কতটা অন্তর দিয়ে ভালোবাসি, তা ভেবে দেখিনি। তিনি যে মিশে আছেন আলো, জল, হাওয়া, মাটিতে। তিনি যে মিশে রয়েছেন আমাদের সমগ্র সত্তা জুড়ে।
দেবীপক্ষ
দেবী দুর্গার আগমন শরৎকালে। শরৎকাল দক্ষিণায়নের মধ্যে পড়ে। এ সময় দেবলোক থাকে নিদ্রিত। তাই দেবীর মহাপুজোর আগে বোধন বা জাগরণ করতে হয়। শরৎকালের বোধন তাই অকাল বোধন। মনে হতে পারে মহামায়াও তাহলে কখনও জেগে থাকেন আবার কখনও ঘুমিয়ে থাকেন। আসলে এই ঘুমিয়ে থাকা মায়ের নিদ্রা নয়। এই নিদ্রা আমাদের। আমরা আত্ম চেতনায় নিদ্রিত। আমরা জেগে রয়েছি কামে, ক্রোধে, লোভে। মোহনিদ্রা ছেড়ে আত্মশক্তিতে জেগে ওঠার নামই বোধন।
ভগবতী দুর্গার দশ হাত দশ দিকের প্রতীক। দশ হাতে দশ প্রকার অস্ত্র ধারণ করে সমস্ত দিক দিগন্ত সমাচ্ছন্ন করে রেখেছেন। আসুরিক শক্তির বিনাশ করছেন। সেই  মহাশক্তি কখনও মাতারূপে আবার কখনও কন্যারূপে পূজিতা হন। তিনি বিরাজ করেন সকল নারীর মধ্যে। তাই তো কুমারী পুজোর আয়োজন। সুপ্ত ও বিক্ষিপ্ত মাতৃশক্তিকে কেন্দ্রীভূত করে জগৎ কল্যাণের কাজে লাগানোর নামই বোধন বা জাগরণ। কোনও ভেদাভেদ নেই, কোন জাতিবিচার নেই— সকলেই একাকার মহামিলনের উৎসবে।
মা মহামায়া, জগজ্জননী আদ্যাশক্তি যে নামেই বলি না কেন তিনি আছেন চিরকাল এই জগৎ জুড়ে। সৃষ্টির আদি থেকেই সেই মাতৃশক্তি সঙ্গে আছেন। আমরা সকলেই সেই সৃষ্টির মধ্যে, কেউ সৃষ্টিছাড়া নই। মহাকালের চক্রে ঘুরতে ঘুরতে আমরা এগিয়ে চলেছি। চলেছি কোন অসীম অনন্তের সন্ধানে। ধনী-নির্ধন, পণ্ডিত-মূর্খ সকলেই চলেছে জীবনের লক্ষ্যে। কোথা থেকে এলাম এ রহস্য অজ্ঞাত। কিন্তু আমাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে পারি না। আমি আছি, আমি আছি। এই ‘কাঁচা আমি’টার গণ্ডি পেরিয়ে মাতৃ-সাধক বলতে চায় ‘আমি ও আমার’- এর  পরিবর্তে ‘মা ও মায়ের’। যা কিছু আছে সবই মা, মা ছাড়া আর কিছু নেই। ‘সর্বরূপময়ী দেবী সর্বং দেবীময়ং জগৎ’। তখন সন্তান অবাক বিস্ময়ে দেখে বিশ্ব চরাচর জুড়ে একই সত্তা– মাতৃসত্তা।
যেমন সাবেকি প্রতিমাতে পুজো হয়,তেমনই আছে অনেক পারিবারিক প্রাচীন পুজো। এছাড়াও থিমের পুজোতে আমরা বেশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। ফলে আমাদের পুজোর আয়োজনে এসেছে পরিবর্তন। আগে মানুষ আনন্দ করত দেবীকে নিয়ে। দেবীকে ঘিরেই উৎসব। পুজো, আরতি ভোগ-রাগ সব কিছুতে ভক্তি হৃদয়ে অংশ নিয়ে মেতে উঠত। শুনতে খারাপ লাগলেও, আজ দেবী লক্ষ্য নয়, দেবী হয়েছেন উপলক্ষ। এমনই আনন্দ করা যায় না, তাই চাই একটা উপলক্ষ। পুজো সেই উপলক্ষ। বিশাল বিশাল প্যান্ডেল, সেখানে দেবীকে বসিয়ে মানুষ নিজেই নিজেকে নিয়ে মত্ত। এ একটা নতুন যুগ, বহির্মুখী মানুষ অন্তরে আনন্দ পায় না। বাইরের সাজগোজ, আড়ম্বরকে বেশি গুরুত্ব দেয়। সবই চলছে নিয়ম মেনে পুজো-পুরোহিত-ভোগ-রাগ পুষ্পাঞ্জলি।
নবদুর্গা
নবরাত্রি শুরু হয়ে যায় মহালয়ার পর থেকে। চলে নবদুর্গার আরাধনা। সে কথা দিয়েই শুরু করা যাক। প্রথম হল শৈল-পুত্রী। শৈল মানে গিরিরাজ হিমালয়। কন্যা রূপে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যা করেছিলেন। দ্বিতীয় রূপ ব্রহ্মচারিণী। যিনি ব্রহ্মজ্ঞান দান করেন। ইনি উমা হৈমবতী। মহিষাসুরকে বধ করার জন্য দেবী প্রস্তুত। দেবতারা নিজ নিজ অঙ্গজ্যোতি দান করলেন। দেবরাজ ইন্দ্র দিলেন ঘণ্টা। এই ঘণ্টার মধ্যে গজরাজ ঐরাবতের মহাশক্তি। ঘণ্টার ধ্বনি তাই প্রচণ্ড। সমস্ত বাদ্যযন্ত্রের শব্দের সমষ্টি। মহাবিশ্বের মূলে যে নাদ-ব্রহ্ম তা এই মহাঘণ্টার শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। নবদুর্গার চতুর্থ মূর্তি কুষ্মাণ্ডা। উষ্মা বলতে বোঝায় তাপ। জগতের দুর্বিষহ ত্রিতাপ হল কুষ্মা। অণ্ড মানে উদর। যিনি জগতের ত্রিতাপ নিজ উদরে বহন করেন তিনি কুষ্মাণ্ডা। কুষ্মাণ্ডা হলেন কল্যাণময়ী জননী। এরপর স্কন্দমাতা। দেবসেনাপতি কার্তিক হলেন স্কন্ধ। মহাদেবী হিমালয়ের কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করেছেন। মা হলেন মেনকা। উমা যখন কিশোরী, দেবতাদের পরামর্শে কামদেব গেলেন শিবের ধ্যান ভঙ্গ করতে। মহাদেবের ক্রোধ দৃষ্টিতে মদন-দেব ভস্মীভূত হলেন। পার্বতী শুরু করলেন কঠোর তপস্যা। মা মেনকা নিষেধ করলেন। বললেন উমা উমা। ‘উ’ মানে হে বৎসে, ‘মা’ মানে আর তপস্যা করো না। সেই থেকে দেবী হলেন ‘উমা’। মায়ের নিষেধ না শুনে কঠোর তপস্যায় মগ্ন হলেন। গাছের পাতা খেয়ে দেহ ধারণ করতেন। তাই ঋষিরা নাম দিলেন অপর্ণা। শিব ও শক্তির মহামিলনে জন্ম নিলেন কুমার কার্তিকেয়। মা হলেন স্কন্দমাতা।
পঞ্চম মূর্তি কাত্যায়নী। সতীর দেহ নিয়ে চলেছেন মহাদেব। বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে খণ্ড খণ্ড করে কাটলেন। ভারতে একান্ন পীঠ তৈরি হল। এক এক পীঠে এক এক মূর্তি রয়েছে মহাদেবীর। বৃন্দাবনে তিনি কাত্যায়নী। ব্রজ-গোপীরা তাই কাত্যায়নী দেবীর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন।
এরপর হল কালরাত্রি। দেবী দুর্গার নাম ও স্বরূপ হল কালরাত্রি। পরব্রহ্মই রাত্রি। ব্রহ্মময়ী মা হলেন ওই রাত্রির শক্তি। রাত্রি হল কর্ম থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্রামের সময়। প্রতিদিন এই রাত্রি-রূপী মায়ের কোলে জীব বিশ্রাম নেয়। মহাপ্রলয়ের রাত্রি মহারাত্রি। তখন সংসার বিলয় হয়। প্রতিদিন মানুষ যার কোলে বিশ্রাম নেয় আবার ভোরে জেগে ওঠে তিনিই কালরাত্রি। নবদুর্গার একরূপ হল মহাগৌরী। দেবী তপস্যায় সিদ্ধি লাভ করলেন। তাঁর দেহের কালো রং দিয়ে দিলেন মহাদেবকে। আর নিজে হলেন গৌরী। শুধু গৌরী নয়, হলেন মহাগৌরী। এরপর সিদ্ধিদাত্রী। সমস্ত কাজে যিনি সাধককে সিদ্ধিদান করেন তিনি সিদ্ধিদাত্রী। সংসারের জীবের মঙ্গল কাজে তিনি পূর্ণ সিদ্ধি দান করেন।
আগেই বলা হয়েছে মহালয়া হল দেবীপক্ষের শুরু। দেবীপক্ষের তাৎপর্য হল মনের প্রস্তুতি। যে মন নিয়ে সংসারের নানা কাজে ব্যস্ত রয়েছি, সেই সংসার-মলিন মন নিয়ে মাতৃ আরাধনা করা যায় না। তাই মনের প্রস্তুতি হয় দেবীপক্ষে। অহং সর্বস্ব মনকে মার্জনা করতে হয় যাতে করে পরিণামে তা সমর্পণের যোগ্য হয়ে ওঠে।
দুর্গাপুজোর তাৎপর্য
দেবী দুর্গার আরাধনা হয় ঘটে, নবপত্রিকাতে ও প্রতিমাতে। বিভিন্ন পুরাণে পাওয়া যায় দেবীর রূপের বর্ণনা। দেবতারা নিজেদের তেজ দান করে সর্বময়ী দেবীর রূপ দিলেন। দেবীমাহাত্ম্যে সেই রূপগ্রহণের বর্ণনা অপূর্ব ও অদ্ভুত। সে বর্ণনায় দেবীর তেজোময়ী রূপের ভাবনা। সমস্ত দেবতার তেজ একত্র হয়ে আদি অন্ত পর্বতের মতো বহ্নিমান হয়ে উঠল। সে তেজ যে কী আকার নেবে সে বিষয়ে দেবতারা তখনও জানতেন না। আকাশজোড়া সে এক জ্যোতির্ময়ী নারীমূর্তি। তিনি দুর্গা, তিনি অম্বা। তাঁর মাথার মুকুট আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত। পৃথিবী কাঁপছে তাঁর পদভরে। অট্টহাসির শব্দে দিগন্ত প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তুমুল অট্টহাসিতে চমকে উঠলেন মহিষাসুর।
সর্বব্যাপী মাকে যিনি অন্তরে ও বাহিরে উপলব্ধি করেন তিনিই শ্রেষ্ঠ মাতৃসাধক। মা তুমিই পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ। তুমি মন, অহংকার, মহৎ ও প্রকৃতি। আবার তুমিই সেই আত্মা ও পরম তত্ত্ব। মাগো, তোমার পরে আর কী বা আছে? কিন্তু সেই দুর্লভ উপলব্ধি সকলের হয় না। 
জ্ঞান, ভক্তি, বিবেক আমরা সকলে চাইতে পারি না। আমরা চাই ‘রূপং দেহি, জয়ং দেহি, যশো দেহি, দ্বিষো জহি’। এই সকাম প্রার্থনার দ্বারা যেমন জাগতিক বস্তু লাভের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। নিষ্কাম সাধকের এই প্রার্থনা আর এক ভিন্ন অর্থ নিয়ে আসে। মা, আমায় আধ্যাত্মিক রূপ দাও, আধ্যাত্মিক জয় ও যশ দাও। কী সেই আধ্যাত্মিক রূপ, জয় ও যশোলাভ? মহামায়া জগজ্জননীর চিন্তা যেন ঘনীভূত হয়ে সাকার হয়ে ওঠে আমার মধ্যে। আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে যে সব শত্রু— কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য এই সব শত্রুদের উপর যেন বিজয় লাভ করতে পারি। আর আধ্যাত্মিক অনুভূতি লাভে যেন শ্রেষ্ঠ স্থান লাভ করি।
অকাল বোধন
শরৎকালের পুজোকে বলে অকাল বোধন। দেবতাদের এই সময় নিদ্রার সময়। তাই বোধন বা জাগরণ। মাঘ থেকে আষাঢ় ছ’মাস উত্তরায়ণ। দেবতাদের দিন। শরৎকাল দক্ষিণায়নের মধ্যে। তখন ভগবতী দুর্গা নিদ্রিত। আমরা নিদ্রিতা দেবীকে জাগাই। এ হল নারী চেতনার প্রতীকী আবাহন। রাজা সুরথ দেবীর পুজো করেছিলেন বসন্তকালে। তখন জাগরণের প্রয়োজন ছিল না।
কৃত্তিবাসী রামায়ণে অকালবোধনের কথা রয়েছে। রাবণকে বধ করার জন্য শ্রীরামচন্দ্রের এই অকাল বোধন। ব্রহ্মা স্বয়ং শরতের রাত্রে দেবীকে আবাহন করেন। ব্রহ্মা ব্যাকুল হয়ে দেবীর স্তব করতে থাকেন। সঙ্গে অন্যান্য দেবতারাও রয়েছেন। তাঁরা দেখলেন এক দিব্য কুমারীকে। তিনি বললেন— দেবী দুর্গা আমাকে পাঠিয়েছেন। আগামী কাল তোমরা বেল গাছের তলায় তাঁর বোধন কর। ভগবতী তোমাদের প্রার্থনায় জাগ্রত হবেন। শ্রীরামের ইচ্ছা পূর্ণ হবে। দেবলোক ছেড়ে মর্তে এলেন সকলে। সন্ধান করতে লাগলেন কোথায় সেই বেলগাছ। অবশেষে দেখতে পেলেন এক বিশাল বেলগাছ। তার তলায় রাশিকৃত বেলপাতা। তার মধ্যে ঘুমিয়ে আছেন এক দিব্য অলংকারে সজ্জিত অপূর্ব মনোহর এক বালিকা। ব্রহ্মা অবাক হলেন। যিনি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের প্রসবিনী তিনি এইভাবে এখানে ঘুমিয়ে আছেন। ব্রহ্মা করজোড়ে করলেন স্তুতি—‘ত্বং স্বাহা, ত্বং স্বধা ত্বং হি বষট্কারস্বরাত্মিকা’। হে দেবী তুমি উচ্চকে নীচ, নীচকে উচ্চ করতে পার। তুমি  চন্দ্রকে সূর্য, সূর্যকে চন্দ্র করতে পার। ধীরে ধীরে ভগবতী বালিকা মিলিয়ে গেলেন। যতদিন সৃষ্টি থাকবে স্বর্গ, মর্ত ও পাতালে সকলেই তোমার পুজো করবে। 
এই পুজো বাংলা ছাড়িয়ে বিশ্বের বহু দেশে আজ ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্গাপুজোকে ঘিরে শুধু ধর্মীয় আচার, অনুষ্ঠান নয়, গড়ে উঠছে এক নতুন সংস্কৃতি, নানা প্রকার উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ। প্রাচ্য পাশ্চাত্যের মিলন সেতু হয়ে উঠেছে বাংলার দুর্গাপুজো।
জ্যান্তদুর্গার বোধন
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে স্বামী বিবেকানন্দের বিখ্যাত উক্তি। তিনি এক চিঠিতে লিখছেন— ‘আমেরিকা ইউরোপে কী দেখছি? শক্তির পূজা, শক্তির পূজা। তবু এরা অজান্তে পূজা করে, কামের দ্বারা করে। আর যারা বিশুদ্ধভাবে, সাত্ত্বিকভাবে, মাতৃভাবে পূজা করবে, তাদের কি কল্যাণ না হবে!’  
গুরুভাই শিবানন্দ স্বামীকে আরও লিখছেন ‘জ্যান্ত দুর্গার পূজা করে দেখাব, তবে আমার নাম’। স্বামীজি ‘জ্যান্ত দুর্গা’ বলতে শ্রীমা সারদাদেবীকে বুঝিয়েছেন। বৃহৎ অর্থে নারী শক্তির জাগরণ। না হলে কোনও দেশ কোনও জাতি উন্নত হতে পারে না।
স্বামীজি মঠে ১৯০১ সালে নিজে শুরু করলেন দুর্গাপুজো। শ্রীমা সারদাদেবীর নামে ‘সঙ্কল্প’ হল। আজও তাই  হয়ে আসছে। 
একটু পিছিয়ে যেতে হবে আমাদের। দেবতারা যখন জেগে উঠবেন, সেই সময় বাংলায় জয়রামবাটিতে পল্লির শ্যামল ছায়ায় পৌষ মাসে এলেন দেবী-মানবী সারদা। রাবণকে বধ করার জন্য যে জাগরণ হয়েছিল, এখন এ যুগে ‘যেই রাম, যেই কৃষ্ণ, একাধারে রামকৃষ্ণ’ মহাশক্তির জাগরণ ঘটিয়ে বললেন—‘হে বালে, হে মহাশক্তির অধীশ্বরী মাতঃ ত্রিপুরসুন্দরী। ইহার সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর। স্বয়ংসিদ্ধা মা জগতের ভার নিতে নিজে এগিয়ে এলেন। স্বামীজি শ্রীরামকৃষ্ণকে লক্ষ করে রচনা করলেন— ‘খণ্ডন ভব বন্ধন’। কিন্তু মায়ের জন্য রইল সপ্তশতী চণ্ডীর সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে...। 
এই দেবী দুর্গা বর্তমান যুগে এই মাটির পৃথিবীতে এসেছিলেন, অনেকে তা জানেন। দেবী দুর্গার কাহিনিতে কিছু আমরা পরাক্রম, অসুর নিধনের পাশাপাশি পাই মাতৃরূপের। শ্রীমা সারদাদেবী ছিলেন লৌকিক ও অলৌকিকের এক অসাধারণ মিশ্রণ। কখনও তিনি এক পতিব্রতা গৃহিণী, স্নেহময়ী জননী এর থেকে বেশি কিছু মনে হয় না। আবার কখনও তাঁর জ্ঞানসমৃদ্ধ বাক্য প্রয়োগ, কখনও দিব্য আচরণ, সকলের মনের গভীরে অনায়াসে বিচরণ করেন তিনি,তখন যেন তাঁকে বোঝা যায় না, ধরাছোঁয়ার বাইরের জগতের তিনি।
যেন আলো-আঁধারের রহস্যময়তা আমাদের বিভ্রান্ত করে। মেঘ আর বিদ্যুৎ যেন একসঙ্গে মিশে এক বিস্ময়কর অবস্থার সৃষ্টি হয়। একদিকে শ্রীরামকৃষ্ণ ত্যাগের মহিমায় যিনি সুপরিচিত, সকলে তাঁকে পরম ত্যাগী পুরুষ বলেই জানেন। অর্থ সম্পদের প্রতি লোভ নেই, সামান্য কিছু জিনিসও সঞ্চয় করতে পারেন না। অন্যদিকে শ্রীমা সারদাদেবী রাধু, মাকু, ভাইপো, ভাইঝি নিয়ে পুরোপুরি সংসারী। গঙ্গায় কত কিছু ভেসে যায়, তাতে কি গঙ্গা অপবিত্র হয়? শ্রীমায়ের জীবনও তাই সকলকে নিয়ে বিশ্ব জননীর রূপ।
এখানে প্রতিবেশীর সেবা আছে, আছে শিশু সারদার পাখা হাতে ক্ষুধার্তের খিচুড়ি ঠান্ডা করা অপার স্নেহ। অকৃত্রিম ও সর্বব্যাপী মাতৃত্ব তাঁকে বিশ্ব মাতৃত্বের সুউচ্চ আদর্শে প্রতিষ্ঠিত করেছে। জাতি, বর্ণ, ধর্ম, শিক্ষা কোনও কিছুই তাঁর মাতৃস্নেহের পথে কোনও অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। শ্রীশ্রী চণ্ডীতে মহামায়া বলছেন—‘একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা।’ শ্রীমা সকলকে এক দেখতেন। সামাজিক অবস্থান, শিক্ষা, মর্যাদা প্রভৃতির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মানুষকে ভিন্ন দেখি। আমাদের এই বিভেদ দৃষ্টি একাত্ম হতে দেয় না, ভালোবাসতে দেয় না নিঃস্বার্থভাবে, একান্তভাবে। শ্রীমা একাত্মভাবে দুলে বাগদির ভেতর যিনি, তোমার ভেতরও তিনি। সকলের উচ্ছিষ্ট নিয়ে সানন্দে বলছেন ‘ছত্রিশ কোথায় সব যে আমার’। এই তো শ্রীশ্রীচণ্ডীর আধুনিকতম ভাষ্য। দ্বিতীয়া কা মমা পরা।
স্বামীজি জ্যান্তদুর্গা শ্রীমাকে কী মর্যাদা দিতেন, অনেকের জানা আছে নিশ্চয়ই। মায়ের দর্শনে গিয়ে বারে বারে গঙ্গাজল পান করে নিজেকে আরও শুদ্ধ পবিত্র করে নেওয়ার চেষ্টা,অথবা আমেরিকা যাওয়ার পূর্বে মায়ের আশীর্বাদের উপর নির্ভর করেন বীরেশ্বর স্বামীজি। শ্রীমায়ের একই সঙ্গে ঐশী চেতনা ও বাস্তব সম্বন্ধে উদাসীন না থাকা তাঁর ব্যক্তিত্বকে অপূর্ব মাধুর্য দান করেছে। ঐশী শক্তির অযথা প্রকাশ করে তিনি বিভ্রান্ত করেননি। আমরা সাধারণত অলৌকিকতা দেখতে পছন্দ করি, তা না পেলে কোথাও যেন মনে হয়, শক্তির কিছুটা খর্বতা রয়েছে। শ্রীমায়ের তাৎক্ষণিক চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বলতা ছিল না, কিন্তু রাতের নির্জনতা যেমন নিঃশব্দে শিশিরপাতে হাজার হাজার ফুলকে বিকশিত করে, তিনিও তেমনই অলক্ষ্যে কত হৃদয়ে যে প্রেরণার কুসুম ফুটিয়ে তুলেছেন, করে চলেছেন, কে তার হিসাব রাখে। অতি হীন ডাকাতও মুহূর্তে ভক্তে পরিণত হয়েছে।
শ্রীরামকৃষ্ণ যাঁকে ষোড়শীরূপে পুজো করেছেন,যাঁকে ভবিষ্যৎ মানুষের কাছে ঈশ্বরী-মানবীর এক অভিনব আদর্শ হিসাবে স্থাপন করে গেছেন। চিন্ময় শ্রীরামকৃষ্ণের নিত্য অবস্থান চিন্ময়ী শক্তিরূপেমায়ের সঙ্গে।
ঘরে ঘরে জ্যান্ত দুর্গাদের মহিমা জাগাতেই তো দুর্গাপুজোর আয়োজন। দুর্গা কেবল পুজো মণ্ডপে নয়, দুর্গার বেদী সাজাতে হবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে। দেবীর আরাধনা ও আমাদের জীবনের মাঝেতাই চিন্তার বিস্তর ফাঁক থেকে যাচ্ছে। প্রতি বছর ধূমধাম করে পুজো করছি, অথচ সমাজে গৃহে দুর্গাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারছি না। অসুর নিধন কেবল প্যান্ডেলে নয়, আমাদের বাস্তব জীবনেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তবেই তো হবে দুর্গাপুজো। কেবল প্রতিমা নয়, সমাজের শ্রদ্ধাঞ্জলি যেন গৃহীদুর্গাদের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত হয়। নারী নিজের শক্তিতে নিজের পায়ে দাঁড়াক, শালীনতা, পবিত্রতা ও তেজোবীর্যের উপর ভিত্তি করে।
শারদীয়া দুর্গাপুজোর দেবীপক্ষে আবাহন জানাই মহাশক্তিকে। দশপ্রহরণধারিণী আমাদের বাহুতে শক্তি, হৃদয়ে ভক্তি দিন। পূজার্চনার পরিধি থেকে তিনি আসুন আমাদের জীবনের আঙিনায়। ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ দান করে তিনি যেন আমাদের ধন্য কৃতার্থ করেন। সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে কেবল মায়ের সন্তান হিসাবে আমরা যেন প্রার্থনা জানাতে পারি— ‘দুর্গাং দেবীং শরণমহং প্রপদ্যে সুতরসিতরসে নমঃ।’

সম্পর্কিত সংবাদ