Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

‘ধর্ম সহিষ্ণুতা শেখায়,’ পুজোর ডিউটি করতে করতেই মন্তব্য জসিমউদ্দিনের

‘ধর্ম সহিষ্ণুতা শেখায়,’ পুজোর ডিউটি করতে করতেই মন্তব্য জসিমউদ্দিনের
  • ৪ নভেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: জসিমউদ্দিন হক বলেন, ‘ধর্ম তো সহিষ্ণু হতে শেখায়। আমাদের এ বাংলায় কোনও ভেদাভেদ নেই।’ তিনি নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করেন। বারাসতে কালীপুজোয় রাত জেগে ডিউটি করছেন এখন। 
Advertisement
‘কালীপুজোয় অংশ নিয়েছেন। কেমন লাগছে?’ এই প্রশ্নের উত্তরেই সহিষ্ণুতার উল্লেখ জসিমউদ্দিনের। তিনি একা নন। বারাসতে কালীপুজোর নিরাপত্তার দায়িত্ব মূলত কাঁধে তুলে নিয়েছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষরাই। 
‘প্রতিমার সামনে ভিড় করবেন না কেউ। প্যান্ডেলে হাত দেবেন না’- ক্রমাগত হুইসল বাজিয়ে দর্শনার্থীদের সামলাচ্ছেন নিরাপত্তা রক্ষী ইকবাল খান, জসিমউদ্দিন হক, ইয়াসিন মহম্মদরা। গোটা দেশকে ধর্মীয় বেড়াজাল দিয়ে এখন বাঁধার চেষ্টা চলছে। বারাসত-মধ্যমগ্রামে সে জাল ছিঁড়ে দিয়েছেন এই রক্ষীরা। বলেন, ‘প্রকৃত ধর্মশিক্ষা আলাদা করার শিক্ষা দেয় না। একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকার নির্দেশ দেয়। ধর্ম নিয়ে যাঁরা রাজনীতি করেন তাঁরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বিভেদ বাঁধানোর চেষ্টা করেন। তাঁদের বলি, এখানে এসে শিখে যান সম্প্রীতি কাকে বলে।’
কালী ও দুর্গাপুজোতে ইকবাল, ইয়াসিনদের বেশি টাকা রোজগার হয়। সারারাত ডিউটি। সকাল ১০টায় বাড়ি ফেরা। বছরের অন্য সময় ডিউটি করলে দিনে ৬০০ টাকা রোজগার। পুজোর সময় তা বেড়ে প্রতিদিন এক হাজার টাকা। বারাসত বা মধ্যমগ্রামের কালীপুজোর জৌলুস দেখতে ভিড় ভেঙে পড়ে। রাজ্যজুড়ে এখানকার পুজোর নামডাক। রকমারি থিম, চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জা দেখতে লক্ষ লক্ষ মানুষ আসেন। তবে এবার যেন সবকিছুর উপরে উঠে নজর কাড়ছে সম্প্রীতির এই চিত্র। মধ্যমগ্রাম ও বারাসতের ছোট বা বড় পুজোর সুরক্ষার দায়িত্ব পুরোটাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের কাঁধে। দুপুর থেকেই ভিড় উপছে পড়ছে বিভিন্ন ছোট ও বড় কালীপুজোর প্যান্ডেলে। সুরক্ষা বজায় রাখতে পলক ফেলছেন না রক্ষীরা। প্রতিটি প্যান্ডেলেই পুলিস নিরাপত্তারক্ষী রাখতে বলেছে। নির্দেশ মতো প্রতিটি পুজো কমিটিই একাধিক এজেন্সি মারফৎ রক্ষী নিযোগ করেছে। 
মধ্যমগ্রাম শহরের একটি নামকরা পুজো প্যান্ডেলের নিরাপত্তার দায়িত্বে ইয়াসিন। তাঁর বাড়ি আমডাঙায়। বলেন, ‘বাইকে করে বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ আসি ডিউটিতে। ভিড় বাড়লে চাপ বাড়ে। নিষ্ঠাভরে কাজ করি।’ বারাসত শহরের একটি মণ্ডপে হুইসল বাজাতে বাজাতে দর্শনার্থীদের সচেতন করছিলেন ইকবাল খান। বলছেন, ‘মায়ের সামনে ভিড় করবেন না। নিজে ঠাকুর দেখুন অপরকেও দেখার সুযোগ করে দিন।’ ছোট থেকে সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকার সুবাদে কালীকে ‘মা’ বলতে শিখেছেন তিনি। পুজো উদ্যোক্তা বলেন, ‘এই ডাকের মধ্যে অস্বাভাবিকতা নেই। এ বাংলায় এটাই স্বাভাবিক।’ আর কথার ছলে ইকবাল বলেন, ‘আমার বাড়ি হাড়োয়ায়। ট্রেনে আসি। চারটে নাগাদ পৌঁছই। সারারাত ডিউটি। সকালে ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরি। প্যান্ডেলে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়। ভালো লাগে। উৎসব তো মিলনক্ষেত্র। তাই না।’ মধ্যমগ্রামের অন্য একটি পুজো মণ্ডপে বসে ছবি তুলছিলেন কয়েকজন তরুণ-তরুণী। বাঁশি বাজিয়ে ভিড় না করতে সতর্ক করলেন সিকিউরিটি জসিমউদ্দিন। শুক্রবার তখন রাত সাড়ে ১২টা বাজে। একটানা কাজ করে একটু ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। মণ্ডপসজ্জায় হাত দিলে চিৎকার করে ফেলছেন। বলেন, ‘ছবি তোলার কি ধুম। ছবিপ্রেমীদের সরাতেই আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত।’ তারপর ওই প্রশ্নটির উত্তরে বললেন, ‘আমার ধর্ম বিশ্বাসের। আমার ধর্মবিশ্বাস সহিষ্ণু হতে শেখায়।’
সম্পর্কিত সংবাদ