উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশক। জমিদারি দেখাশোনা করতে তখন মাঝেমধ্যেই কুষ্টিয়ার শিলাইদহে যেতে হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। একদিন কবি বজরার ছাদে বসে পদ্মার শোভা উপভোগ করছিলেন। সেই সময় পিঠে চিঠির থলে নিয়ে গান গাইতে গাইতে নদীপাড়ের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন শিলাইদহ পোস্ট অফিসের ডাক হরকরা। যেটুকু শুনতে পেলেন, তাতেই মুগ্ধ কবি। খোঁজ নিয়ে জানলেন, সেই গায়কের আসল নাম গগনচন্দ্র দাম। তবে গাঁয়ের লোক তাঁকে গগন হরকরা নামে চেনে। আর চেনে তাঁর গানকে। তাঁর কণ্ঠে অনায়াসে উঠে আসে লালনের বাণী, বাউলের পদ। নিজেও গান লিখে সুর দিয়ে গেয়ে বেড়ান গ্রাম-গ্রামান্তরে। রবীন্দ্রনাথ একদিন সেই গগনকে ডেকে পাঠালেন গান শুনবেন বলে। সেই হল দু’জনের প্রথম সাক্ষাৎ। তারপর রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে গেলেই গগনের গান শুনতে ভুলতেন না। দু’জনের মধ্যে গড়ে উঠেছিল বাণী-সুরের এক অমলিন মেলবন্ধন। গগনের গানে বরাবরই মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ। লালনের গান, বাউলের নানা পদ ততদিনে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিসত্ত্বাকেও প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। তিনি তন্ময় হয়ে শুনছেন গগন হরকরার গান—‘আমি কোথায় পাব তারে/আমার মনের মানুষ যে রে/হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে/দেশ-বিদেশে বেড়াই ঘুরে…।’ ১৯০৫ সাল। বঙ্গভঙ্গে উদ্যত লর্ড কার্জন। বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার অধ্যাদেশ জারি হতেই শুরু হল তুমুল আলোড়ন। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামলেন লাখো মানুষ। রবীন্দ্রনাথ ঘরে বসে থাকলেন না। শামিল হলেন সেই প্রতিবাদে। স্বদেশ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তখন গানে, কবিতায় প্রতিবাদের নতুন ইতিহাস রচিত হচ্ছে। সেই সন্ধিক্ষণে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি/চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি…।’ এই গানে সুরারোপ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ আরও একবার ফিরে গেলেন শিলাইদহে। গগনের গান ‘আমি কোথায় পাব তারে’-র সুর আশ্রয় করেই রচিত হল রবীন্দ্রনাথের এ গানের সুর। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ তাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ঘোষণা করে সেই গানকেই।



