অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো, বর্গি এল দেশে। প্রাচীন এই ছড়া আজও মা, ঠাকুমারা শিশুদের শুনিয়ে ঘুম পাড়ান। ২৮৩ বছর আগে এই বর্গি আক্রমণ বাংলার গ্রামে গ্রামে আছড়ে পড়েছিল। বর্গি হামলার নেপথ্যে ছিলেন মারাঠা দস্যু ভাস্কর পণ্ডিত। বর্গি হামলা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কম লেখালেখি হয়নি। কিন্তু ওই ভাস্কর পণ্ডিত কিন্তু দাঁইহাটে দুর্গা পুজো করেছিলেন।
তৎকালীন বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁ আক্রমণ করলে নবমীর রাতেই ভাস্কর পণ্ডিত মায়ের পুজো অসমাপ্ত রেখে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ফলে ওই দুর্গামূর্তির ভাগীরথীতে অকাল বিসর্জন হয়েছিল। ভাস্কর পণ্ডিতের সেই অসমাপ্ত পুজোর ইতিহাস বাঁচাতে এখনও তাঁর নামেই পুজো করেন দাঁইহাটের বাসিন্দারা। বর্ধমানের রাজাদের যে কাছারি বাড়িতে বর্গিরাজ ভাস্কর পণ্ডিত অর্ধসমাপ্ত দুর্গাপুজো করেছিলেন, সেই বাড়ির ধ্বংসাবশেষ ঘিরেই স্থানীয়দের আবেগ রয়েছে। সেখানেই আজও ভাস্কর পণ্ডিত দুর্গাপুজো কমিটির উদ্যোগে পুজো হয়ে আসছে৷
১৭৪২ সালে প্রায় ৪০ হাজার মারাঠা সৈন্য নিয়ে বাংলা আক্রমণ করেন বর্গি সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিত। নবাব আলিবর্দি তখন বর্ধমানে ছিলেন। সেখানেই নিজের সেনা নিয়ে নবাব কে ঘিরে ধরেন ভাস্কর পণ্ডিত। নবাবের কাছে দেড় লক্ষ টাকা দাবি করে বসে বর্গীরা। নবাব দাবি না মানলে শুরু হয় যুদ্ধ। তবে গেরিলা যুদ্ধে পারদর্শী বর্গীদের সঙ্গে প্রথমে এঁটে উঠতে পারেননি নবাব। ভাস্কর পণ্ডিতের দল নবাবের পিছু ধাওয়া করে কাটোয়ায় পৌঁছান। দাঁইহাটের বর্ধমান রাজার কাছারি বাড়ি দখল করে থাকতে শুরু করে বর্গীরা। দাঁইহাট ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে শুরু হয় বর্গীদের লুট। এরই মধ্যে আসে শরৎকাল। পুজোর আমেজে ভাসে বাংলা। ভাস্কর পন্ডিত স্থির করেন তিনিও দুর্গাপুজো করবেন। শুরু হয় আয়োজন। আশপাশের গ্রাম-নগর থেকে আসতে শুরু করে নজরানা। আলীবর্দী এমনই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। পুজো নিয়ে মেতে থাকা বর্গীদের অতর্কিতে হামলা করে বাংলা ছাড়া করার ছক কষেন নবাব। দিনটা ১৭৪২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। মহানবমীর সন্ধ্যারতি শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে ভাগীরথী পেরিয়ে বর্গীদের পুজো স্থলে অতর্কিতে হামলা চালিয়েছিল নবাবি সেনারা। বর্গীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। প্রতিরোধ অসম্ভব বুঝে পিছু হটতে থাকে তাঁরা। ভাস্কর পণ্ডিত নিজের পুজো অসমাপ্ত রেখেই মহারাষ্ট্রের পথে পাড়ি দেন। কথিত আছে, তাঁর কাছে থাকা দুর্গামূর্তি পাছে বিধর্মীদের হাতে পড়ে তাই যাওয়ার সময় সেই বিগ্রহ ভাগীরথীর জলে ফেলে দিয়ে গিয়েছিলেন বর্গী সেনাপতি। এখনও বর্ধমান রাজাদের তৈরি কাছারি বাড়ির একটা ভাঙা প্রাচীর রয়েছে৷ এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, এখানেই নাকি ভাস্কর পণ্ডিত পুজো করেছিলেন৷ তাই সেই ইতিহাস এখনও জনসমক্ষে তুলে ধরতে তাঁর নামে পুজো হয়৷ পুজো কমিটির সভাপতি শুভাশিস প্রামাণিক বলেন, নবমীর রাতে ভাস্কর পণ্ডিতের পুজো চলাকালীন আলীবর্দী খাঁ তাঁর ঘাঁটিতে আক্রমণ করেন। প্রাণে বাঁচতে পুজো শেষ না করেই ঘোড়া ছুটিয়ে মহারাষ্ট্রের পথ ধরেছিলেন ভাস্কর।



