Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ললাট লিখন

ললাট লিখন
  • ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
কপালের লিখন খণ্ডাবে কে? গত ২১ মাসে তাঁর মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে অপসারণ চেয়ে বারবার সরব হয়েছে বিরোধীরা। নিজের দলের বিক্ষুব্ধ একটা বড় অংশের বিধায়করাও একই দাবিতে সরব ছিলেন। রাজ্যের হিংসা পরিস্থিতিতে যখন কোনও লাগাম টানা যাচ্ছে না, পুলিস-প্রশাসন সম্পূর্ণ ব্যর্থ, রাজ্যের মানুষকে যে সরকার নিরাপত্তা দিতে পারেনি তারা কেন ক্ষমতায় থাকবে— সেই প্রশ্নও তুলেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ। তবু তাঁকে টলানো যায়নি। কারণ নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহের আশীর্বাদের লম্বা হাত ছিল তাঁর মাথায়। কিন্তু তবু শেষরক্ষা হল না। ২০২৭-এ রাজ্য বিধানসভা ভোটের দু’বছরেরও বেশি সময় আগে রবিবার মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিলেন ‘বিতর্কিত’ বীরেন সিং। শত অভিযোগ সত্ত্বেও যে অমিত শাহ এতদিন তাঁকে গদিতে বসিয়ে রেখেছিলেন সেই তাঁর নির্দেশেই সরতে হল বীরেনকে। সংঘর্ষদীর্ণ উত্তর-পূর্বের ছোট রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করায় রাতারাতি সেই রাজ্যে শান্তি ফিরে আসবে—এমন ভাবা ভুল। কারণ ওই রাজ্যের বিবদমান দুই সম্প্রদায় কুকি ও মেইতেইদের মধ্যে বিরোধের যে স্থায়ী বীজ পুঁতে দিয়েছে বিজেপি সরকার, একা বীরেনের পদত্যাগে তাতে প্রলেপ পড়বে বলে মনে হয় না। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মণিপুরের রাজ্যপাল সেখানে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ব-কলমে সেই কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীই রাজ্য চালাবে। অথবা শাসক দলেরই অন্য কোনও নেতা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে সরকার চালাতে পারেন। সেক্ষেত্রে নতুন মুখ্যমন্ত্রী যে সম্প্রদায়ের হবেন বিরুদ্ধ সম্প্রদায়ের তাঁকে মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে। তাই একমাত্র সমাধান হতে পারে চলতি বিধানসভা ভেঙে দিয়ে মণিপুরে দ্রুত বিধানসভা নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু সেক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা আছে। নির্বাচন হলে বিজেপি সেখানে ফের ক্ষমতায় আসবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই রাজ্যের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি রসাতলে গেলেও এখনই মণিপুরে নির্বাচন করতে মোদি-শাহরা উৎসাহিত হবেন কি না সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ফলে মণিপুরের ভবিষ্যৎ কম-বেশি আজকের মতোই একইরকম অনিশ্চিত। তবে আপাতত তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে বীরেনকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
Advertisement
এত জলঘোলা করে বীরেন সিং কেন পদত্যাগ করলেন তা নিয়ে সম্ভাব্য দুটি কারণ শোনা যাচ্ছে। এক, সোমবার সেখানে যে বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল (মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগে যা স্থগিত রেখেছেন রাজ্যপাল), সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার কথা ছিল কংগ্রেসের। এতে বীরেনের সমস্যা হতো না। কিন্তু এই অনাস্থা প্রস্তাবকে সমর্থনের কথা জানিয়েছিল বিজেপি ও তার সহযোগী বড় একটি অংশের বিধায়করা। যার অর্থ, অনাস্থায় বীরেনের পরাজয় ছিল সময়ের অপেক্ষা। তেমনটা হলে গোটা মন্ত্রিসভাকে পদত্যাগ করতে হতো। সেই লজ্জাজনক পরিস্থিতি এড়াতেই মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন কৌশলী অমিত শাহ। কারণ, বীরেন-বিরোধী বিক্ষুব্ধদের যে ক্ষোভ ধূমায়িত হয়ে উঠেছিল তাকে প্রশমিত করার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। দুই, একটি অডিও টেপই বীরেনের কাল হল। অভিযোগ ওঠে, ওই টেপে নাকি মুখ্যমন্ত্রীকে বলতে শোনা গিয়েছে যে, তিনি ‘সংঘর্ষ’ থামাতে কোনও সদর্থক ভূমিকা নেননি। এই নিয়ে মামলা হলে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে টেপের গলা পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞরা রিপোর্ট জমা দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালতে। টেপের গলা বীরেনের বলেই বিশেষজ্ঞরা আশি শতাংশ নাকি নিশ্চিত হয়েছেন। সন্দেহ নেই, এটা সত্যি হলে বীরেনের বিপদ ঘনিয়ে আসার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। সেটা আঁচ করেই হয়তো তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন শাহ। কারণ যাই হোক, বীরেনের পদত্যাগকে বিরোধী এবং বিজেপি দলের বিক্ষুব্ধরা তাঁদের নৈতিক জয় হিসেবেই দেখছেন। সেই জয়কে উদযাপন করতে রবিবার রাতে কোথাও কোথাও উৎসবও হয়েছে। 
ডাবল ইঞ্জিনের রাজ্য মণিপুরে জাতি সংঘর্ষের সূত্রপাত ২০২৩ সালের ৩ মে। বেশ কয়েকমাস নাগাড়ে অশান্তি চলার পর মাঝে কিছুদিন শান্ত ছিল এই পাহাড়ি রাজ্য। কিন্তু গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ফের অশান্তির আগুনে ছারখার হয়েছে এই জনপদ। সরকারি হিসেবে, গত ২১ মাসে জাতি-হিংসায় ২৫৮ জনের প্রাণ গিয়েছে। লক্ষাধিক মানুষ এখনও ঘরছাড়া। আহত এবং নিখোঁজ বহু। এই মণিপুরেই হাজারও চোখের সামনে মহিলাকে নগ্ন করে হাঁটানোর ভয়ঙ্কর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে গোটা দেশ। এই পরিস্থিতির মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিংয়ের (তৎকালীন) বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। তাঁর পরোক্ষ মদত এবং উস্কানিতে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ। প্রথম দিকে তাঁর নিজের সম্প্রদায় মেইতেইরা বীরেনের পাশে ছিলেন। কিন্তু নিজেদের সম্প্রদায়ের মুখ্যমন্ত্রী তাঁদেরই নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় মেইতেইরাও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ফলে ৬০ আসন বিশিষ্ট বিধানসভায় তাঁর শেষলগ্নে মাত্র ১৪ জন বিধায়ক বীরেনের পাশে ছিলেন। এবার তাই দিল্লির মাতব্বরেরাও বীরেনকে ‘বাঁচাতে’ পারলেন না। 
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ