


সমৃদ্ধ দত্ত: এ হল প্রতিরোধের ভোট। বিভাজন, আর বিদ্বেষের এখানে প্রবেশ নিষেধ। দাঙ্গা-রাজনীতিকে নির্মূল করার প্রতিজ্ঞা পূরণ হবে এবার। গত ৮০ বছরে আটজন মুখ্যমন্ত্রীর কেউই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যও দিল্লি দৌড়াননি। বাংলার জন্য সিদ্ধান্ত বাংলাতেই হয়েছে। আগামী দিনেও ‘বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা’ বাংলাতেই হবে। দিল্লি থেকে বাঙালির ভাগ্যনিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া হবে না। প্রচণ্ড দাবদাহেও হাসতে হাসতে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী নির্বিঘ্নে না হতে দেওয়ার মরিয়া চক্রান্ত ভেস্তে দেওয়ার ভোট এটা। গরিব বাঙালিকে উসকে দিয়ে গরিব বাঙালিরই ঘরে আগুন আর মাথায় লাঠি মারার প্ল্যান আটকে দেওয়ার ভোট। হিন্দু বনাম মুসলিম তকমা দিয়ে বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠকে বিষাক্ত করতে না দেওয়ার শপথ নিয়েছে এই ভোট।
এ হল প্রতিবাদের ভোট।
যখন রাজ্যে রাজ্যে বাঙালিকে মাতৃভাষা বলার অপরাধে গণপ্রহার দেওয়া হয়েছে, থানায় আটকে রাখা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে, তখন কোথায় ছিলেন বাংলাকে উদ্ধার করতে আসা ভিনদেশি পরিযায়ী তারকাদের দল? গঙ্গাবক্ষে ভ্রমণ, আর ঝালমুড়ির স্বাদ নেওয়া ট্যুরিস্ট প্রধানমন্ত্রীর একটিও বিবৃতি কেন দেখা গেল না যে, বাঙালিকে হেনস্তা করা চলবে না? নরেন্দ্র মোদির ওই ইচ্ছাকৃত নীরবতার প্রতিবাদ করবে বাংলা। ভোট দিয়ে। গোটা দেশের মধ্যে একমাত্র বাঙালিকেই ঘৃণা করে, দর্পভরে প্রতিদিন সংঘ পরিবারের নানাবিধ শাখা, দল, সমর্থক, অনুগতরা বলে চলেছে—রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি, ঘুসপেটিয়া। বাঙালির রক্ষাকর্তা হতে আসা কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা প্রতিটি ঘটনা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে থাকে। তার প্রতিবাদ হবে। হচ্ছে। কেউ পায় বুলেট ট্রেন। কেউ পায় এক্সপ্রেসওয়ে। কেউ পায় সেমিকন্ডাক্টর কারখানা। কেউ পায় বন্দে ভারত নির্মাণের লাগাতার অর্ডার। কেউ আবার একের পর এক এয়ারপোর্ট কিংবা রাজ্যের সর্বত্র মেট্রোরেল সম্প্রসারণ। একমাত্র কোন রাজ্য পায় না কিছুই? বাংলা। না পাওয়ার রঙের নাম তাই আজ প্রতিবাদ।
এ হল প্রত্যাঘাতের ভোট।
গ্রামের মানুষ যেন আয় না করতে পারে। তাই ১০০ দিনের কাজের টাকা বন্ধ। কেউ যেন ঘর না পায়। তাই আবাসনের টাকা আটকে। কেউ যেন জল না পায়। তাই পানীয় জলের প্রকল্প থমকে। বাঙালি আমাকে ভোট দেয় না। তাই বাঙালিকে ভাতে মারো। বাঙালিকে দাঙ্গায় জড়িয়ে দিয়ে হাতেও মারো। বঙ্গধ্বংসের ষড়যন্ত্রকে পালটা জবাব দেওয়ার পালা এবার। মঙ্গলবার, নবরাত্রি, দুর্গাপুজো প্রতিটি পরবে মাছমাংসের দোকান জোর করে বন্ধ করা হয় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে। এ রাজ্যেও সেই অপসংস্কৃতি চালুর চেষ্টা হচ্ছে। খাস রাজধানী দিল্লিতে বিজেপি নেতামন্ত্রীদের এই দাদাগিরির সাক্ষী প্রবাসী বাঙালি। বছরভর প্রচার করা হয়, আমিষ খাওয়া বাঙালি অপবিত্র। আর ভোট পাওয়ার জন্য কলকাতায় এসে মাছবন্দনা? দিল্লি থেকে কপালে তিলক কেটে এসে মাছ খেতে খেতে ভিডিয়ো করা? এসব দ্বিচারিতার জবাব এবার মিলবে!
২৭ লক্ষ মানুষকে অনাগরিক করে দিয়েছেন। তারা বিনিদ্র রজনী কাটাচ্ছে আতঙ্কে। হুংকার দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার—নাম কাটা গেলেই নাকি দেশছাড়া করা হবে। একের পর এক বিএলও আত্মহত্যা করেছে। আমাদের ঘরের মানুষ তারা। স্রেফ বিনা অপরাধে যাদের মৃত্যু। নির্বাচন কমিশনের তুঘলকি সিদ্ধান্তে। এই মৃত্যুমিছিল, এই নিজভূমে পরবাসী হয়ে যাওয়া, অন্য রাজ্যে যখন তখন রোহিঙ্গা অপবাদ শোনা, কলকাতাকে বস্তির শহর বলা, ৭১ বছর বয়সি এক নারীকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ তাচ্ছিল্য, আর অপমান করার অন্তহীন অশিক্ষা-উৎসব! এসব কি চুপ করে সহ্য করে যেতে হবে? না। তাই, এ হল প্রতিশোধের ভোট!