


অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: বাংলার পরিযায়ী শ্রমিক অত্যাচার, নির্যাতনের ইস্যু গোটা দেশের নজর কেড়েছে। বিজেপি শাসিত তাঁদের বাংলাদেশী সন্দেহে হেনস্থার ঘটনায় একযোগে সরব হয়েছে রাজ্যের শাসক শিবির এবং বাম শিবির। এবার সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে গবেষণা করা কৃতী ছাত্রীকে প্রার্থী করেছে বামফ্রন্ট। নাম লাবণী জঙ্গি। আদ্যপ্রান্ত বামপন্থী পরিবারে জন্ম। বছর পঁয়ত্রিশের এই তরুণীর এখন কাঁটাছেঁড়া করছেন কীভাবে রামে যাওয়া ‘পরিযায়ী’ বাম ভোট ফিরিয়ে আনা যায়। তিনি লড়ছেন সিপিআইএম (লিবারেশন)-এর প্রতীকে। প্রতিপক্ষ রাজ্যের মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস। কেন্দ্র কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভা।
কেন্দ্রটি মধ্যে ধুবুলিয়ার মতো উদ্বাস্তু কলোনি রয়েছে। যেখানে দেশভাগের যন্ত্রণা এখনও দগদগে। কর্মসূত্রে গ্রামের মানুষের ভিনরাজ্যে যাওয়ার প্রবণতাও বেশি। রাজনৈতিক মহল বলছে, এহেন নজরকাড়া কেন্দ্রে হেভিওয়েটের বিরুদ্ধে পরিযায়ী শ্রমিকদের মন নিয়ে গবেষণা করা তরুণ প্রজন্মের নতুন মুখকেই বাজি ধরছেন বামেরা। লাবণী শুধু গবেষকই নন। শিল্পচর্চাও তাঁর শিরা-উপশিরায়। এটাও তাঁর আলাদা পরিচিতি বহন করে। ২০২৪ সালে আর্ট অ্যাণ্ড সোশ্যাল জার্নালিজমের উপর ‘টিএম কৃষ্ণা পারি’ পুরস্কার পেয়েছেন। বামপন্থী আন্দোলন এবং মিছিলের জন্য বিভিন্ন পোস্টার, ব্যানারে অভিনব আইডিয়ার ছবি এঁকে সমাজের বিভিন্ন দিককে তুলেও ধরেছিলেন তিনি।
দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহু মানুষ এসে উঠেছিলেন ধুবুলিয়ায়। ওপার বাংলার মানুষের ভোট এই বিধানসভায় নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়ে থাকে নির্বাচনে। বর্তমান সময়ে ধুবুলিয়া থেকে বহু মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ভিন রাজ্যে কাজে যান। সম্প্রতি অসমে কাজে যাওয়ার জন্য ধুবুলিয়ার দু’জন পরিযায়ী শ্রমিককে এনআরসির নোটিস পাঠিয়েছিল অসম সরকার। আশ্রয়ের খোঁজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মানুষের পরিযায়ী হওয়া, আবার সেখান থেকে জীবিকার তাগিদে নতুন গন্তব্যে পাড়ি—এই নিরন্তর জীবনের প্রবাহমান গতিই গভীরভাবে নাড়া দেয় ধুবুলিয়া এলাকার দীর্ঘদিনের বাম নেতা লিয়াকত আলি জঙ্গির মেয়ে লাবণী জঙ্গিকে। বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও সেভাবে নেতৃস্থানীয় দায়িত্বভার কোনোদিন নেননি তিনি। কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক হন। তারপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে স্নাতকোত্তর লাভ করেন। পরে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্স, কলকাতা থেকে সমাজবিজ্ঞানে এমফিল এবং পিএইচডি করেন। গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল ‘বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক’। তাতে পরিযায়ী শ্রমিকদের আর্থ সামাজিক অবস্থা সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। বাম প্রার্থীর দাবি, দেশ জুড়ে যখন বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকরা ‘জেনোসাইডে’র শিকার হচ্ছেন, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে রাজনীতির ময়দানকে ব্যবহার করে মানুষের কাছে পোঁছে যাওয়া। যাতে গবেষণার অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাস্তব রাজনীতির মেলবন্ধন তৈরি করা যায়। সেই লক্ষ্যেই রামে চলে যাওয়া বাম ভোটকে ফিরিয়ে আনার কাজকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছেন তিনি।
প্রচারে ঘুরতে ঘুরতে লাবণী এদিন বলছিলেন, ‘বামফ্রন্টের জোট প্রার্থী হিসেবে লড়াই করা আমার কাছে একটা বড় ব্যাপার। বড় প্ল্যাটফর্ম। আমি ভোটের দলীয় রাজনীতি করিনি। গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে শ্রমিক এবং বাঙালির ওপর আক্রমণ চলছে। বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে আমি গবেষণা করেছি। কিন্তু পুঁথিগত গবেষণা কিংবা শিল্পকলার মধ্যে একটা সীমাবদ্ধতা থাকে। এবার ভোটের রাজনীতিতে সেই সীমানা পার করে মানুষের কাছে সেই বিষয়গুলি তুলে ধরাই আমার লক্ষ্য।’