Bartaman Logo
১৪ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

শেষ স্বপ্ন

মেসির অবসর ও বিশ্বকাপের স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা চলছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে কি? বিস্তারিত পড়ুন।

শেষ স্বপ্ন
  • ১৪ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সঞ্জয় সরকার: ঠিক এক দশক আগের কথা। সেটাও জুন মাস। আমেরিকাতেই বসেছিল কোপার আসর। টুর্নামেন্টের সেরা দল হিসাবে ফাইনালে পৌঁছায় আর্জেন্তিনা। খেতাবি লড়াইয়ের দু’দিন আগেই ছিল লায়োনেল মেসির জন্মদিন। সতীর্থদের আবদারে কেক কাটলেও উদযাপনটা ফাইনালের জন্য তুলে রাখেন বাঁ-পায়ের জাদুকর। তবে কে জানত, সেবারও খালি হাতেই ফিরতে হবে তাঁকে। ফের টাই-ব্রেকারে হেরে স্বপ্নভঙ্গ। ২০১৪ বিশ্বকাপ সহ টানা তিন বছর তিনটি ফাইনালে হার। নিন্দুকেরা ততক্ষণে শব্দের বাণ চালাতে শুরু করেছেন, ‘মেসি ক্লাবে সফল, দেশের হয়ে নয়!’

Advertisement

রাগ, কষ্ট, অভিমানে দুম করে নিয়ে নেন অবসরের সিদ্ধান্ত। গোটা বিশ্বে আলোড়ন পড়ে যায়। মাত্র ২৯ বছর বয়সে মেসির অবসর! মেনে নিতে পারেনি কেউ। গোটা বিশ্বের মানুষ তাঁকে নীল-সাদা জার্সিতে ফিরে আসার অনুরোধ জানান। অবশেষে একমাস বাদে এএফএ’র প্রেসিডেন্ট ক্লদিও তাপিয়ার পরামর্শে অবসর ভাঙলেন মেসি। ভাগ্যিস! না হলে ছ’বছর বাদে কাতারের লুসেইল স্টেডিয়ামে সেই রাতের সাক্ষী থাকা হত না। ২০১৬ সালে কোপা ফাইনালে টাই-ব্রেকার মিসের পর কেঁদেছিলেন। কাতারেও পেনাল্টি শুট-আউটে গঞ্জালো মন্তিয়েলের শট জালে জড়াতেই কাঁদলেন মেসি। বিশ্বকাপ ট্রফির সামনে তিনি এসে দাঁড়াতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল পৃথিবী। সোনালী ট্রফিটা দু’চোখ ভরে দেখলেন। ছুঁলেনও। তারপর দু’হাত উঁচিয়ে ভাগ্যদেবতাকে ধন্যবাদ জানালেন। হয়তো মনে মনে বললেন, এবার মৃত্যুকেও হাসিমুখে বরণ করে নিতে পারি।
অন্য কেউ হলে হয়তো সেদিনই ফুটবলকে বিদায় জানাতেন। চাঁচাছোলা ভাষায় সমালোচকদের একহাত নিতেন। তবে মেসি অন্য ধাতুর তৈরি। সকলকে ভুল প্রমাণ করে খেলা চালিয়ে গেলেন। আসলে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের অনুভূতির স্পর্শটা গা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাননি। তাই তো অনায়াসে কাটিয়ে দিলেন আরও চারটি বছর। ঘুরে এল আরও একটি বিশ্বকাপ। সেই আমেরিকাতেই। যেখান থেকে তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসের লড়াইটা শুরু হয়েছিল। এবার কি মেসি পারবেন ফের একবার বিশ্বসেরার মুকুট অর্জন করতে? তবে না হলেও ক্ষতি নেই। কারণ, এবার ব্যর্থ হলেও আর তাঁকে শুনতে হবে না, ‘ক্লাবের হয়ে সফল, দেশের জার্সিতে নয়।’
দু’দশক আগে এমনই এক জুন মাসেই সার্বিয়া-মন্তেনেগ্রোর বিরুদ্ধে যে পথ চলা শুরু হয়েছিল, এবার তা থামার অপেক্ষায়। তাই তো দেশের মাটিতে শেষ ম্যাচ খেলার দিনই জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আর ফেরার কোনো পথ নেই। তবে বিদায়ের আগে অবশ্যই আবারও দেশবাসীকে বিশ্বজয়ের অনুভূতিটা ফিরিয়ে দিতে চাই।’
একই অনুভূতির আশায় আমেরিকায় পা রেখেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোও। ক্লাব ফুটবলে দু’জনের নাম উচ্চারিত হলে আজও ভাগ হয়ে যায় যে কোনো তর্কের আসর। তবে বিশ্বসেরার মুকুট অর্জনের দৌড়ে রোনাল্ডোকে অনেকটাই পিছনে ফেলেছেন তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু দেশের জার্সিতে প্রথম সাফল্য তাঁরই। ২০১৬ সালে মেসির অবসরের সপ্তাহ দুয়েকে বাদেই সিআর সেভেনের হাতে উঠেছিল ইউরো কাপ। যদিও ফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে মাত্র ২৫ মিনিটেই চোটের কারণে মাঠ ছাড়েন। ছোট্ট বাচ্চাদের মতো কেঁদেও ভাসান। তবে বাকি সময়টা চোটের ব্যথা উপেক্ষা করে ডাগ-আউট থেকে সতীর্থদের তাতানোর দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন নিজের কাঁধে। আর অতিরিক্ত সময়ে এডের জাল কাঁপাতেই হাউহাউ করে কেঁদে ওঠেন ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ সিআর সেভেন। সেদিন মেসি সমর্থকদের সামনে কলার উচিয়ে ঘুরেছিলেন রোনাল্ডো অনুরাগীরা। কিন্তু বিশ্বকাপে পাশা উলটে গেল। ২০১৮ রাশিয়াতে রোনাল্ডো ছিলেন পর্তুগিজদের স্বপ্নের সওদাগর। স্পেনের বিরুদ্ধে শুরুতেই দুরন্ত হ্যাটট্রিক। অনেকেই ভেবেছিলেন, এটা রোনাল্ডোর বিশ্বকাপ। তবে ‘ফুটবল ইজ নট ওয়ান ম্যান গেম।’ তাই তো বাকিদের ব্যর্থতায় রাউন্ড অব সিক্সটিনেই থামতে হয়েছিল তাঁকে। আসলে বিশ্বকাপের আসরে কখনো ফেভারিটের ট্যাগ অর্জন করতে পারেনি পর্তুগাল। একা রোনাল্ডো স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। অথচ চার বছর বাদে কাতার বিশ্বকাপে তাঁরই জায়গা হয়নি প্রথম একাদশে। প্রথমে কোচ ফার্নান্দো স্যান্টোসের সঙ্গে মতবিরোধ। আর প্রি কোয়ার্টার-ফাইনালে অচেনা গনসালো র‌্যামোস হ্যাটট্রিক করতেই পাকাপাকিভাবে সিআর সেভেনের ঠাঁই হয় রিজার্ভ বেঞ্চে। তবে দল শেষ আট থেকে বিদায় নিতেই আর চুপ থাকেননি। দেশে ফিরে কোচ বদলের পথটা প্রশস্ত করেন। শুরু হয় আরও কড়া অনুশীলন।
অনুশীলনে সময় বাড়ালেও বয়স তো আর থেমে নেই। ভাটা পড়েছে রিফ্লেক্সে। কোমরের দোলায় তাই নেই অতীতের ছন্দ। ফ্রি-কিকও কেমন যেন আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় মত্ত। তাই বুটজোড়া তুলে রাখার ফিসফাস চারদিকে। এই আবহেই ২০২৪ ইউরো খেলতে জার্মানিতে পা রাখেন পর্তুগিজ মহাতারকা। তাঁর সৌজন্যে সেবার কোচের দায়িত্বে রবার্তো মার্তিনেজ। প্রতিটি ম্যাচে তাই প্রথম একাদশে তিনি নিশ্চিত। রোনাল্ডো ভেবেছিলেন, একটা ফিল্ড গোলই তাঁকে ফিরিয়ে দেবে যাবতীয় আত্মবিশ্বাস। কিন্তু না। ৩৯ বছরে ফিট থাকার রসায়ন পুরানো ফর্মে ফেরার জন্য যথেষ্ট নয়। এখন বিপক্ষ ডিফেন্ডাররা তাঁর চোখে চোখ রাখতে পারেন। বল কেড়ে নেন অবলীলায়। আর এখানেই নিজের উপর রাগ হয় রোনাল্ডোর। সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে সতীর্থদের সঙ্গে দূরত্ব। ব্রুনো ফার্নান্ডেজ তো ঠিক করেই নিয়েছেন, তাঁর হাতেই থাকবে ড্রেসিং-রুমের রিমোট কন্ট্রোল। তবে রোনাল্ডো ছাড়ার পাত্র নন।
ইউরো থেকে দল বিদায় নিতেই বিশ্বকাপকে পাখির চোখ করেন রোনাল্ডো। এবার তিনি আরও বেশি ক্ষুরধার। জুভেন্তাস ছেড়ে সৌদি আরবে পাড়ি দেওয়ার সময় তাঁকে শুনতে হয়েছিল, এবার মহাপ্রস্থানের পথে! কিন্তু তিনি হারতে শেখেননি। নিজের জন্য সেট করেন নতুন টার্গেট— হাজার গোলের মাইলফলক। তাই তো জিমে বাড়তি সময় কাটান। চেষ্টা করেন ১০ বছরের ছোটো সতীর্থদের সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে চলার।
দেখতে দেখতে চলে এল ২০২৬ বিশ্বকাপ। এই পর্বে সিআর সেভেন চেষ্টা করেছেন যাবতীয় দূরত্ব মিটিয়ে গোটা দলকে আবারও একটি সুতোয় বাঁধার। তাই তো ২০২২ বিশ্বকাপে যেভাবে মেসির হতে কাপ তুলে দেওয়ার জন্য নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছিলেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ-রডরিগো ডে পলরা, এবার রোনাল্ডোর জন্য সেটাই করার পালা ভিতিনহা-রুবেন ডিয়াজদের। তবে সত্যিই কি তাঁরা পারবেন? রোনাল্ডো অবশ্য নিজেকে নিংড়ে দিতে তৈরি। কাপযুদ্ধের লড়াইয়ে নামার আগে যতই মুখে ২০৩০ বিশ্বকাপে খেলার কথা বলুন না কেন, তিনি জানেন এটাই শেষ সুযোগ। আর হয়তো চাইলেও মিলবে না সুযোগ। তাই বিদায়ের আগে আশায় বুক বাঁধছেন মাদেইরো দ্বীপপুঞ্জের ফুসাল শহরের সেই ‘ছিঁচকাঁদুনে’ ছেলেটা। ছোটোবেলায় খেলার মাঠে তাঁর পাস থেকে কেউ গোল করতে না পারলে রাগে-দুঃখে কেঁদে ফেলতেন। আজও সতীর্থদের কাছ থেকে সাহায্য না পেলে একইভাবে কান্না পায় রোনাল্ডোর।
মেসি না রোনাল্ডো, কার স্বপ্নপূরণ হবে? জানা নেই। তবে এই দুই মহাতারকার বিদায়ে ফুটবল গ্যালাক্সিতে যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা হয়তো কখনও পূরণ হবে না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ