প্রীতেশ বসু, কলকাতা: ঘটনা ১: দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাটের প্রৌঢ়া বিধবা হঠাৎ জানতে পারলেন, তাঁর স্বামীর নামে থাকা ৫৩ ডেসিমেল জমির মধ্যে ৩৪ ডেসিমেলের তথ্য সরকারি তথ্যভাণ্ডারে অন্যের নামে নথিভুক্ত হয়েছে। জমি বিক্রি এবং তারপর মিউটেশন (বিক্রির পরে সরকারি তথ্যভাণ্ডারে জমির মালিকের নাম বদলের পদ্ধতি) করালে তবেই এমনটা হওয়া সম্ভব। তাহলে জমির মালিকের নাম বদল হল কী
করে? অনুসন্ধানে জানা যায়, মিউটেশনের জন্য সংশ্লিষ্ট জমির ডিড বা দলিলের নম্বরের প্রয়োজন পড়ে। এক্ষেত্রে তার পরিবর্তে এক জেলা সভাধিপতির সঙ্গে জনৈক মৎস্য চাষীর একটি জমির লিজ ডিডের নম্বর ব্যবহার করে প্রৌঢ়ার স্বামীর নামে থাকা জমি মিউটেশন হয়ে গিয়েছে অন্যের নামে।
ঘটনা ২: পূর্ব মেদিনীপুরের সুতাহাটা ২ ব্লকের তথ্যভাণ্ডার থেকে রহস্যজনক ভাবে উবে গিয়েছে একটি খতিয়ান। সেই খতিয়ানের অধীন ১১ ডেসিমেল (দু’টি প্লট মিলিয়ে) চলে গিয়েছে অন্য ব্যক্তির নামে থাকা তিনটি খতিয়ানে। এক্ষেত্রেও ‘অবৈধ’ মিউটেশনের ফলেই এই কাণ্ড বলে পরবর্তীকালে তদন্তে উঠে আসে। এখানেও সংশ্লিষ্ট জমির সঙ্গে সম্পর্ক না থাকা একটি গিফ্ট ডিডের নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে।
উল্লেখিত দু’টি ঘটনা ছাড়াও সাম্প্রতিক কালে এমন বেশ কয়েকটি মামলার রায় দিয়েছে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ল্যান্ড রিফর্মস অ্যান্ড টেনেন্সি ট্রাইব্যুনাল’। সেখান থেকেই জমি হাঙরদের এই নয়া ‘মোডাস অপারেন্ডি’ বা কার্যপ্রণালীর পর্দা ফাঁস হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে মিউটেশনের মাধ্যমে অবৈধভাবে জমির মালিকের নাম বদল করতে আসল দলিল জাল করারও প্রয়োজন পড়ছে না। মিউটেশনের সময় যে কোনও দলিলের নম্বর বসিয়েই সরকারি তথ্যভাণ্ডারে নাম বদল করে দেওয়া হচ্ছে। জমির মালিকও জানতে পারছেন না, যাঁর দলিলের নম্বর ব্যবহার করা হল, তিনিও জানতে পারছেন না। এই ঘটনা বিএলআরও বিভাগের এক শ্রেণির আধিকারিকদের যোগসাজশ ছাড়া সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেছে ট্রাইব্যুনাল। তাই সবক’টি ক্ষেত্রেই মিউটেশন বাতিলের পাশাপাশি এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
জানা গিয়েছে, বহুদিন ধরে
ফাঁকা পড়ে থাকা জমি নজরে থাকে জমি-হাঙরদের। জমি একাধিকবার হাতবদল হয়ে থাকলে ধরা পড়ার আশঙ্কা কম থাকে। একমাত্র জমির মালিক কোনও কারণে সরকারি পোর্টাল বা তথ্যভাণ্ডারে খোঁজ করলে তবেই জানতে পারেন যে তাঁর অজান্তে জমি বেহাত হয়ে গিয়েছে। প্রসঙ্গত, এক শ্রেণির আধিকারিকের সঙ্গে জমি-হাঙরদের যোগসাজশ অজানা নয় রাজ্য ভূমি ও ভূমিসংস্কার দপ্তরের। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ‘ঘুঘুর বাসা’ ভাঙারই নির্দেশ দিয়েছেন। সেই লক্ষ্যেই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ১৪ জন আধিকারিকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ১৫ জনের বিরুদ্ধে। কোনও আধিকারিক অনিচ্ছাকৃত ভুল করলে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে সতর্ক হয়ে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।